মেসি কাঁদলেন। আনন্দে। নেইমার কাঁদলেন। দুঃখে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর বিদায়বেলাটিও ভারী হয়ে রইল তাঁর চোখের কোণে এসে যাওয়া ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবস’-র এক ফোঁটা জলে। অথচ, মেসি-রোনাল্ডো-নেইমার পরবর্তী এ মহাপৃথিবীর ধূলিকণায় লিখে ফেলা ফুটবলের নতুন সম্রাটের বিশ্বকাপের প্রস্থানপর্বটি আমাদের বিস্মিত করল। বিস্মিত করল, কারণ, আবেগঘন কোনও মুহূর্তের জন্ম দেওয়া তো দুরস্ত– কিলিয়ান এমবাপের (Kylian Mbappe) বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) অভিযান শেষ হওয়ার আগে শেষ কয়েকটি মিনিট টেলিভিশন ক্যামেরা যতবার তাঁর মুখে ফোকাস করল তাঁকে দেখে মনে হল স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুসের মতোই তিনি আটকে পড়েছেন এক গুহায়, আর তাঁর সামনে সেই আলোকবর্তিকা হয়ে থাকা মাকড়সা, বারবার যে উঠছে আর পড়ছে।

আরও পড়ুন:
হাল ছাড়ছে না। হাসি নেই। কান্না নেই। বিরক্তি নেই। ভাবলেশহীন মুখের কিলিয়ান এমবাপে নিশ্চিত সে মাকড়সার গল্প পড়েছেন। তাঁর চারিত্রিক কাঠামোয় লেগেছে সে আখ্যানের মাটি। তাঁর এই আড়াই দশকের জীবনে, তাঁর খেলে ফেলা তিনটি বিশ্বকাপে তিনি এবং একমাত্র তিনিই প্রথমদিন থেকে ‘ওয়ান্ডার কিড’ থেকে নায়ক হওয়ার মার্গটি তৈরির কাজে নেমে পড়েছেন ধুলোমাটি মেখে। সারজল দিয়েছেন প্রতিভায় আর নিজের শ্রেষ্ঠত্বের বীজটিকে দিয়েছেন এক আকাশ আলো। কিলিয়ান এমবাপে– মোনাকোর উঠতি তারকা থেকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের তিন সর্বশ্রেষ্ঠ তারকার একজন হয়ে ওঠার এই পথে আপনার পাশে ছিল একঝাঁক প্রতিভার ঝলসানিতে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া দিদিয়ের দেশঁর ফ্রান্স। আপনার পাশে একেকটা বিশ্বকাপে থেকেছে কখনও এনগোলো কান্তে, পল পোগবা, আঁতোয়া গ্রিজম্যান, আবার কখনও উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, দেজিরে দুয়ের মতো প্রতিভারা।

দলের ঊর্ধ্বে উঠে আত্মপ্রচার আপনার স্বভাববিরুদ্ধ– মাঠ-মাঠই আপনার জবাব। মার্কস রোহোকে মনে পড়ে? মনে পড়ে ট্যাগলিফিকোকে? রাশিয়া। ২০১৮। আর্জেন্টিনার সঙ্গে আপনার হরিণগতির স্প্রিন্টের সামনে এক মুহূর্তের জন্য মাটিতে লুটিয়ে যাওয়া লাতিন আমেরিকা? আপনার খেলা দেখে ব্রিটিশ মিডিয়া বলেছিল, মাঠে স্নাইপার নামিয়েছে ফ্রান্স। স্প্যানিশ মিডিয়া বলেছিল, নতুন মহাতারকার উত্থান। আপনি জানেন, এই প্রশস্তিবাক্যকে কীভাবে প্রত্যাখ্যান করে আবার একটা বিশ্বকাপে ফিরে আসতে হয়। বিশ্বজয়ের পর থেমে যাওয়ার বদলে, ফের একটা স্প্রিন্ট। ততদিনে বিশ্ববাজারে আপনার ট্রান্সফার নিয়ে হইহই। প্যারিসের লুভ্রে মিউজিয়ামের ভেতর থাকা দূর্মূল্য পেইন্টিংয়ের চেয়েও দামি রত্নটিকে হাতছাড়া করতে চায় না পিএসজি। একইভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশীল ক্লাব, আপনার স্বপ্নের ক্লাব, রিয়াল মাদ্রিদের অফার আপনাকে হাতছানি দেয়। এ ট্রান্সফারের দিকে চেয়ে থাকে তামাম দুনিয়া। কিন্তু আপনি, এসব আলোর বৃত্তের বাইরে গিয়ে বিশ্বকাপে ঝড় তুলছেন। কাতার বিশ্বকাপ– গোলের ফোয়ারা– তারপর? একটা ফাইনাল। একটা লিওনেল মেসি। সম্মুখ সমর। পিটার ড্রুরির সেই স্তোত্র হয়ে যাওয়া লিওনেল মেসির বিশ্বজয়ের কমেন্ট্রি পিসের পাশে আপনার জন্য বরাদ্দ সম্ভ্রমটুকু– ‘And one feels for Mbappe, who scored a World Cup final hat-trick and lost. How can that be?’

পঁচাত্তরটা মিনিট। লিওনেল স্কালোনির মগজাস্ত্রে হাঁসফাঁস করতে থাকা ফ্রান্সের বুকে দেওয়া অক্সিজেন– ওই ডান পায়ের ঝটিকা গোলা– বিশ্বকাপের সেরা কিপার দিবু মার্টিনেজকে হতবাক করে দিয়ে কেঁপে যাওয়া জাল– লুসেল স্টেডিয়ামের সেই শেষ আধঘণ্টা– বিশ্বের কাছে আপনার কলজের জোর… যেখানে হার না মানা রবার্ট ব্রুসের সেই মাকড়সার কাহিনিখানা খোদাই করা ছিল। তা দেখে নিল সব্বাই। জাল বানিয়ে ফেলা সে মাকড়সা যেভাবে শেষ ধাপে খসে পড়ে, আপনিও পড়লেন। কিন্তু গল্পের বাঁধুনিখানা থেকে গেল আপনার ভেতর। হাসি-কান্না-অভিমানের জাগতিক স্ফূরণ পেরিয়ে আপনি থেকে গেলেন ইতিহাসে। আপনার জার্সির বাজারদর কম হতে পারে, আপনার বিশ্বজোড়া অনুগামী সংখ্যা মেসি-রোনাল্ডোর তুলনায় কম হতে পারে কিন্তু ইতিহাসের পাতায় আপনাকে নিয়ে লেখা অধ্যায়ের জৌলুস এতটুকু কমাতে পারবে না বাজার। সে ইতিহাসের নাগালই পাবে না কেউ। পেলে-মেসি-এমবাপে– এই ত্রয়ীর বিশ্বকাপ রেকর্ডবুক কথা বলবে আজীবন। আর, সত্যের সামনেও দুনিয়াকে নত হতে হবে যে আপনি মাত্র সাতাশ বছর বয়সে দুই মহীরুহের পাশে নিজেকে স্থাপন করেছেন। একা।

খেলা শেষের আগে আপনি একটিই অস্বস্তিকর কাজ করে বসলেন। স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমোনকে ধাক্কা দিলেন। কার্ড দেখলেন। ব্যস। আপনার বিদায়গাথার আগমনীতে এটুকুই মুহূর্ত জমা হল কেবল। এই ধাক্কা কি বিরক্তিতে? কষ্টে? ব্রুসের মাকড়সা যখন ফের উপর থেকে খসে পড়ে, সমস্ত সম্ভাবনা নিয়েও শেষ মুহূর্ত থেকে ফিরতে হয় আবার গোড়ায়। তখন তার ছটফট করতে থাকা পায়ের যে অভিমান তা-ই বেরিয়ে আসছিল শেষ মিনিটে। কিলিয়ান এমবাপে– আপনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। আপনি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে হ্যাটট্রিক শিকারি। কিন্তু তারও আগে, আপনি যোদ্ধা– একবার-দু’-বার-তিনবার শেষ ধাপে গিয়ে ফিরে আসতে হলেও চতুর্থবার আপনার ফিরে আসা হবে আরও ভয়ঙ্কর। আরও জোরাল। এই ওঠা-পড়ার যে জলের দাগ, তা নিঃশব্দে লিখে রাখছে ইতিহাস। কান্না-হাসির চেনা চেনা মুহূর্ত না-ই বা উপহার দিলেন আপনি, ইতিহাসের পাতাটা যেদিন উলটোবে, সেদিন আপনার নামের পাশে সবচেয়ে সুগন্ধী ফুলটা রেখে দেবে সময়। দেবেই।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত! দিলজিৎদের ‘রুখতে’ এবার ওটিটিতেও সেন্সরের পথে কেন্দ্র
-
পুজো মণ্ডপে প্রথমবার পি সি সরকারের ম্যাজিক দেখবে কলকাতা! তুঙ্গে প্রস্তুতি
-
সানি পা রাখতেই রাতারাতি ‘হটস্পট’ মন্দারমণি! ভিনরাজ্য থেকেও হোটেল বুকিংয়ের হিড়িক
-
গড়িয়াহাট থেকে শ্যামবাজার! রথযাত্রায় ট্রামে চড়ে শহর ঘুরবেন জগন্নাথ-বলরাম-শুভদ্রা
-
‘ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবো না’, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যর্থ রোহিতকে বড় বার্তা গম্ভীরের
