বছর ছ’য়েক আগের কথা। তখন তিনি লা লিগায় নতুন।
২০২০-র চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কথা বলছি। রিয়াল মাদ্রিদের একটা ম্যাচের মধ্যেই ভিনিকে লক্ষ্য করে, হঠাৎই ফেরলান মেন্ডিকে বলেছিলেন করিম বেঞ্জেমা। “ভিনিকে অত পাস দেওযার দরকার নেই। মনে তো হয়, আমাদের বিরুদ্ধেই খেলছে।”
আরও পড়ুন:
সদ্য রিয়ালে যোগ দেওয়া ভিনি যাতে এই কথাগুলি শুনে আঘাত পান, তারজন্যই করিম বেঞ্জেমার এই কথাগুলি বলা। এখনকার ভাষায় বুলিং করা। কিন্তু কথাগুলি আর শুধুই ভিনিসিয়াস জুনিয়রের মধ্যে আবদ্ধ থাকল কোথায়? ম্যাচ চালাকালীন রিয়াল স্ট্রাইকারের পুরো সংলাপই চলে আসে টিভির পর্দায়। মিডিয়ার কাছে এর থেকে হট টপিক আর কিছু হয় না কি? আলোড়ন উঠে যায় লা লিগায়।
এই পরিস্থিতিতে আমি-আপনি কী করতাম? মানসিক ভাবে ভেঙে পড়তাম। বন্ধুদের কাছে দুঃখের কথা শেয়ার করতাম। কিন্তু ভিনিসিয়াস জুনিয়র তো, আর আম আদমি নন। তিনি ফুটবল খেলে পৃথিবী জয় করতে এসেছেন। করিম বেঞ্জেমার এই কথাগুলিকেই উপরে ওঠার সোপান হিসেবে ব্যবহার করলেন। ফলাফল? ঠিক পরের মরশুমেই রিয়াল মাদ্রিদে সেরা অ্যাটাকিং জুটির নাম, করিম বেঞ্জেমা-ভিনিসিয়াস জুনিয়র। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতল রিয়াল। আর ভিনিসিয়াসকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য রাখলেন বেঞ্জেমা।
বিবৃতির লড়াই নয়। মুখের জবাব, পাল্টা মুখে নয়। বরং যখনই তাঁর অস্তিত্ব, তার দক্ষতা নিয়ে কথা উঠেছে, এভাবেই নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র।

ব্রাজিলের জাতীয় জার্সিতে শুরু সেই ২০১৯-এ। তারপর থেকে ধীরে ধীরে দলের ব্যাটন যে নেইমারের থেকে ভিনির হাতে নিঃশব্দে চালান হয়ে গিয়েছে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার পড়ে না। নেইমার নিজেও কি বোঝেন না? গ্রুপের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভিনির জোড়া গোল দেখার পর, সাংবাদিকদের সামনে এসে ব্রাজিল তারকা নিজেই বলছেন, “ভিনি এখন আমাদের দলের সেরা ফুটবলার।” বিশ্বাস করুন, এই কথা শুধুই নেইমারের নয়। ম্যাচ শেষে যখন ব্রাজিলিয়ান দর্শকদের সঙ্গে কথা বলছিলাম, বুঝলাম, এই প্রজন্মের দর্শকদের ভালবাসার পাল্লাও কিন্তু ঝুঁকে পড়েছে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের প্রতি। কারণ, ম্যাচ শেষে যখন হার্ড রক স্টেডিয়াম ছেড়ে ফুটবলাররা একে একে বাসে ওঠার জন্য তোড়জোড় করছিলেন, নেইমারের পাশাপাশি ভিনিসিয়াস জুনিয়র আসতেই পাগল হয়ে ওঠে হলুদ জনতা। নেইমারের হাত থেকে অটোগ্রাফের খাতাগুলি নিঃশব্দে ট্রান্সফার হয়ে যায় ভিনিসিয়াস জুনিয়রের হাতে। এক তারকার অস্তমিত হওয়ার পথে, আরেক তারকার উদয়, আমরা তো ইতিহাসে দেখে দেখে অভ্যস্ত। আর ইতিহাস বলে এক্ষেত্রে ‘ইগো’-র লড়াই অনির্বায্য।

কিন্তু ব্রাজিল ড্রেসিংরুমে নেইমার-ভিনির সম্পর্কের রসায়নটাই যে অন্যরকম।
দাদা-ভাই।
নিউ জার্সির বেস ক্যাম্পে প্র্যাকটিস না থাকলে ভিনির শখ হচ্ছে, ভিডিও গেম খেলা। বিশেষ করে ‘ফিফা স্পোর্টস এসি’। আর কে না জানে, এই ভিডিও গেম নিয়েও নেইমারের পাগলামির কথা? ব্রাজিলের সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসা করুন, ভিডিও গেমের এই মাঠেও, এখনও রাজা কিন্তু নেইমার। ম্যাচ আর প্র্যাকটিসের বাইরে অবসর সময় পেলেই দুই ‘ভাই’ শুরু করে দিচ্ছেন ভিডিও গেমের যুদ্ধ। আর সেখানেও ভিনির ‘গাইড’ হচ্ছেন, নেইমার জুনিয়র। শুধু কি মাঠের বাইরে? গতকাল হার্ড রক স্টেডিয়ামে মাঠের ভিতর নেমারের ভিনিকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্যপট চোখে ভাসেনি? ম্যাচ শেষে মিক্সড জোন থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকরা যখন ভিনিকে ঘিরে ধরেছেন, কোনওরকম রাখ ঢাক না রেখে ব্রাজিলিয়ান তারকা উইঙ্গার বলে দেন, “চোট কাটিয়ে নেইমারের দলে ফিরে আসাটা আমাদের জন্য অক্সিজেনের কাজ করেছে। ওর মতো তারকা ফুটবলারের পাশে খেলতে পারাটাও তো আমার জন্য অনেক কিছু।”

সবাই লিওনেল মেসির দিকে তাকিয়ে আছেন। কিলিয়ান এমবাপের গোল সংখ্যা গুনছেন। কিন্তু সকলের অলক্ষ্যে যে ভিনিসিয়াস জুনিয়র উঠে এসে ‘গোল্ডেন বুটের’ দাবিদার হিসেবে নিজের ডাল-পালা ছড়াতে শুরু করেছেন, এতক্ষণ যেন সেটা সকলের দৃষ্টির অগোচরেই ছিল। কিন্তু তথ্য বলছে, তিন ম্যাচ চার গোল করে ভিনিও এখন সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে ডানা মেলেছেন। শুধুই কি তাই? এতদিন এক বিশ্বকাপের মঞ্চে কোনও ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের টানা তিনটে ম্যাচে গোল করার রেকর্ড ছিল, শুধুই রোনাল্ডো নাজারিও আর রিভাল্ডোর পকেটে। আমেরিকার বিশ্বকাপ থেকে সেই রেকর্ডেও ভাগ বসালেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিল উইঙ্গারের উত্থানে সে আপনি যতই বিস্মিত হোন না কেন, কোচ কার্লো আন্সেলোত্তি অন্তত এই একটি বিষয়ে আগে থেকেই সাফল্যর বিষয়ে এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে, এদিন ম্যাচ শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে বললেন, “ভিনি হচ্ছে এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। বিশ্বকাপে ওর সাফল্য নিয়ে আমার কোনও সন্দেহই ছিল না।”
ম্যাচ শেষে যখন হার্ড রক স্টেডিয়াম ছেড়ে ফুটবলাররা একে একে বাসে ওঠার জন্য তোড়জোড় করছিলেন, নেইমারের পাশাপাশি ভিনিসিয়াস জুনিয়র আসতেই পাগল হয়ে ওঠে হলুদ জনতা। নেইমারের হাত থেকে অটোগ্রাফের খাতাগুলি নিঃশব্দে ট্রান্সফার হয়ে যায় ভিনিসিয়াস জুনিয়রের হাতে। এক তারকার অস্তমিত হওয়ার পথে, আরেক তারকার উদয়, আমরা তো ইতিহাসে দেখে দেখে অভ্যস্ত।
সমর্থকরা বলছেন। কোচ বলছেন। সতীর্থরা প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছেন। আর ভিনিসিয়াস জুনিয়র? তিনি নিজে কী বলছেন? মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে পর্তুগিজে বলছিলেন, “কোচ ম্যাচের আগে আমার সঙ্গে একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমি আর যাই করি, হেডে গোল করতে পারব না। আর যদি সেটা করতে পারি, আমাকে উপহার দেবেন।” বলেই হেসে ফেললেন ভিনি।
কোচ আন্সেলোত্তি পরে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে সেই কথা স্বীকারও করেন। প্রিয় ছাত্রর কথা প্রসঙ্গে হেসে বলেন, “একদমই ঠিক। ওর একটা উপহার পাওনা আছে। আজকে ও শুধু ভালোই খেলেনি। হেডে একটা গোলও করেছে!” যাঁদের জুটিকে আদর করে ব্রাজিল সমর্থকরা বলতে শুরু করেছেন ‘ভিন্সেলোত্তি’। অর্থাৎ, ভিনিসিয়াস এবং আন্সেলোত্তি!

অথচ বিশ্বকাপ শুরুর আগে নেইমারের চোটের জন্য প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল, ভিনি কি পারবে এই দলটাকে টানতে? তাঁর কাঁধ কি এতটাই শক্ত, যতটা রোমারিও’র ছিল? জাতীয় দলের জার্সিতে মাঝে কিছুটা অফ ফর্মে চলে যাওয়াতেই সমর্থকদের মনে ভিনিকে নিয়ে এই আশঙ্কার উৎপত্তি। এদিন মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে সেই কথাও বলছিলেন তিনি, “বিশ্বাস ছিল, আমি পারব। আর বিশ্বকাপের মঞ্চে ঘুরে দাঁড়ানোর থেকে ভাল আর কিছুই হতে পারে না।”
তিন বছর আগে তাঁকে এনডোর্স করা এক বিখ্যাত জুতো প্রস্তুতকারী সংস্থার মনে হয়েছিল, রিয়ালে তাঁর থেকে অন্য কয়েকজন ফুটবলারকেই গুরুত্ব দিলে লাভ বেশি। প্রতিবাদে একটা ম্যাচে সেই জুতো প্রস্তুতকারী সংস্থার কোনও লোগো ছাড়াই, পুরো কালো রঙয়ের জুতো পড়ে খেলতে নেমে যান।
এমনিতেই বিশ্বজুড়ে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ভিনিসিয়াস জুনিয়র হচ্ছেন লড়াইয়ের মুখ। এমনিতে চুপচাপ। হাসিখুশি। কিন্তু তার প্রতি অবিচার কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। এই তো তিন বছর আগে তাঁকে এনডোর্স করা এক বিখ্যাত জুতো প্রস্তুতকারী সংস্থার মনে হয়েছিল, রিয়ালে তাঁর থেকে অন্য কয়েকজন ফুটবলারকেই গুরুত্ব দিলে লাভ বেশি। প্রতিবাদে একটা ম্যাচে সেই জুতো প্রস্তুতকারী সংস্থার কোনও লোগো ছাড়াই, পুরো কালো রঙয়ের জুতো পড়ে খেলতে নেমে যান। সংস্থাটি বাধ্য হয়, তাঁর সঙ্গে চুক্তি নবীকরণ করতে।

ভিনিসিয়াস জুনিয়র এরকমই। মুখে নয়। কাজে দেখান। আর ‘গুরু’ জিনেদিন জিদানের সেই পরামর্শটা? “স্পিড নিয়ে একদম ভেব না। সেটা ভগবান তোমাকে দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। তোমার কাজ হচ্ছে, বল নিয়ে বক্সে ঢুকে গেলে জাস্ট মাথাটা একটু ঠান্ডা রাখা।”
বক্সের ভিতর ভিনিসিয়াস জুনিয়রের মাথা ঠান্ডা থাকলে কী হয়, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন বিশ্বকাপের প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা। গোল করার আগে স্কটল্যান্ডের জ্যাক হেন্ড্রিকের সঙ্গে পায়ে পা না লাগিয়ে ফেললে বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিকটাও হয়ে যেত।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
পরচুলা পরতেন বলেই খুন কেতন? ‘মোটিভ’ নিয়ে নয়া তত্ত্ব, মুখ খুললেন প্রয়াত তরুণের বাবা
-
বাংলার নতুন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘ম্যাট্রিক্স ওয়ান’, ক্লাসিক ছবি-সহ থাকছে একগুচ্ছ চমক
-
টাকা নিয়ে তারাতলার ত্রুটিযুক্ত প্ল্যান পাশ! মাথায় ‘ক্যামাক স্ট্রিটে’র হাত? পুলিশ হেফাজতে কালী
-
গ্রুপের শেষ ম্যাচে শুরু থেকে খেলবেন না মেসি! বিকল্প ভাবছেন কোচ স্কালোনি
-
‘অগ্নির সঙ্গে একদিন সিনেমা নিয়ে বসব’, পুরমন্ত্রীকে নিয়ে কোন পরিকল্পনার কথা জানালেন ঋতুপর্ণা?
