ভাবছিলাম, কলকাতা হলে কী হত? নিউ জার্সির প্রিন্সটনে যেখানে আছি, সেখানে থেকে গাড়িতে মিনিট ২০ গেলেই ১২২ মার্সার স্ট্রিট। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, সাধারণ আবাসিকের একটি বাড়ি। কিন্তু বাড়ির একদা মালিকের কার্যকলাপ জানলে তো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়।
জীবনের শেষ বাইশটা বছর নিউ জার্সির এই প্রিন্সটনের বাড়িতেই কাটিয়েছেন স্যর আলবার্ট আইনস্টাইন। শুনলাম, তাঁর শেষ ইচ্ছে ছিল, এই বাড়িতে কখনও যেন তাঁর কোনও মূর্তি না বসানো হয়। কখনও যেন জাদুঘরেও রূপান্তরিত না হয়। ফলে এই বাড়ির পাশ থেকে চলে গেলেও বুঝতেই পারবেন না, বিশ্বের অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্রর পাশ থেকে অহরহ যাচ্ছেন, আসছেন। ভাবুন তো, কলকাতায় হলে কী হতে পারত! কিন্তু আমেরিকার অধিবাসীরা সব ব্যাপারেই বড় বেশি নিরাসক্ত।
আরও পড়ুন:
অথচ এই নিরাসক্ত দেশটাতেই এখন মহাযজ্ঞের প্রস্তুতি। দ্বিতীয়বারের জন্য সকার-বিশ্বকাপ হচ্ছে ট্রাম্পের দেশে। অথচ চিরকাল ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকার ফুটবলপণ্ডিতরা বলে এসেছেন, ‘আমেরিকাতে আবার ফুটবল।” কিন্তু বিশ্বাস করুন, স্রেফ একজন মানুষ তাঁর পা-দিয়ে কীভাবে আস্ত একটা দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে চাবুকের মতো ঘুরিয়ে দিতে পারেন। ডেভিড বেকহ্যাম যখন লিওনেল মেসিকে (Lionel Messi) ইন্টার মায়ামিতে সই করিয়েছিলেন, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এটা হয়তো অবসরকালীন সময়ে পেনশন স্কিমের পরিকল্পনা। কিন্তু আজ এমএলএস-এর টিকিটের হাহাকার আর স্পনসরশিপের গ্রাফ যেভাবে স্ট্যাচু অব লিবার্টির উচ্চতা ছুঁতে চাইছে, তাতে একটা ব্যাপার পরিষ্কার, মেসি নামক পরশপাথরটা না ছোঁয়ালে আমেরিকার এই বিশ্বকাপ আয়োজনটাই হয়তো ম্যাড়মেড়ে থেকে যেত।
মেসিকে নিয়ে পাগলামিটা কোন স্তরে পৌঁছেছে শুনবেন? আর্জেন্টিনার অফিশিয়াল ব্রডকাস্টার ‘টিওয়াইসি স্পোর্টস’ এবার একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়েছে। প্রযুক্তির নাম দিয়েছে ‘মেসিক্যাম’। গোটা ম্যাচ জুড়ে একটা ক্যামেরা নাকি শুধু আর্জেন্টাইন মহাতারকার ওপর ফোকাস করে থাকবে। তিনি বল পায়ে ড্রিবল করছেন, নাকি অফ দ্য বল স্পেস তৈরি করছেন, নাকি সাইডলাইনে এসে জুতোর ফিতে বাঁধছেন বা জল খাচ্ছেন-বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ নাকি টিকিটের পয়সা উশুল করতে শুধু ওই একটা ক্যামেরা দিয়েই ম্যাচ দেখবে। বিশ্বফুটবলে কোনো প্লেয়ারকে নিয়ে এই পর্যায়ের আবেগতাড়িত হওয়া আগে কেউ কখনও দেখা যায়নি। ভবিষ্যতেও হয়তো দেখা যাবে না।
কিন্তু একটা প্রশ্ন রীতিমতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কাতারেই যাঁর আজন্ম লালিত স্বপ্নর বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে, ৩৯ ছুঁই ছুঁই সেই ম্যাজিসিয়ানের এই বিশ্বকাপে তাগিদটা কী? চোট-আঘাতের সামান্য ধোঁয়াশা থাকলেও ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে মেসি যে মাঠে নামবেন, তা বোঝার জন্য আইনস্টাইন হওয়ার দরকার নেই। চার বছর আগে কাতারে সৌদি আরবের সেই প্রথম ম্যাচের ধাক্কাটা স্কালোনি সম্ভবত এখনও ভোলেননি। সেই কারণেই হয়তো কোলাহল থেকে দূরে, নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার কানসাস সিটিকে বেছে নিয়েছেন আর্জেন্টিনার বেস ক্যাম্প হিসেবে। কানসাসের অ্যারোহেড স্টেডিয়াম বা স্পোর্টিং কানসাস সিটির ট্রেনিং সুযোগ-সুবিধা দেখলে চোখ কপালে উঠবে। যে আধুনিক ‘স্পোর্টস সায়েন্স’ আর ‘রিকভারি ল্যাব’ এখানে রাখা হয়েছে, তা রিয়াল মাদ্রিদ বা ম্যাঞ্চেস্টার সিটিকেও দশ গোল দেবে। ২৪ জুন যিনি ৩৯ বছরের যৌবনে পা দেবেন, সেই আর্জেন্টাইন তারকাকে সব দিক থেকে ফিট রাখতেই হয়তো কানসাসের এখানে বেস ক্যাম্প বানিয়েছেন স্কালোনি।
এরই মধ্যে আবার অদ্ভুত এক নস্টালজিয়া আর বিষাদের সুর ছড়িয়ে দিয়েছেন স্বয়ং ফুটবল ঈশ্বর। ইনস্টাগ্রামে নিজের অনুশীলনের একটা ভিডিও পোস্ট করেছেন মেসি। যেখানে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে আর্জেন্টিনার রক সঙ্গীতের ঈশ্বর, ইন্দিও সোলারির বিখ্যাত সই গান, ‘এনকাউন্টার উইথ অ্যান অ্যামেচার এঞ্জেল’। গত শুক্রবারই সাতাত্তর বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন এই কিংবদন্তি। পুরো আর্জেন্টিনা যখন শোকে স্তব্ধ, মেসি তখন বেছে নিলেন সোলারির সেই গান, যা তিনি ২০২১ সালে পার্কিনসন্স রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় গেয়েছিলেন। উথালপাথাল বুক নিয়ে জীবনের শেষ বিশ্বকাপে মাঠে নামতে চলেছেন ফুটবল ঈশ্বর। কেরিয়ারের এই অন্তিম সময়ে নিজের সঙ্গে এই নিরন্তর লড়াইয়ের পরিস্থিতি বোঝানোর জন্যই কি বেছে নিলেন ইন্দিও সোলারির সেই বিখ্যাত গানের লাইন? তিনি কি বুঝে গিয়েছেন শরীর আর সায় দিচ্ছে না, শুধু মনের জোরেই টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কোটি কোটি মানুষের স্বপ্নকে?
তবে বাইরে যাই হোক, ভেতরের খবর কিন্তু স্কালোনির জন্য খুব একটা স্বস্তির নয়। লিওনার্দো বালের্দির পেশি ছিঁড়ে যাওয়ায় বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) থেকেই ছিটকে গিয়েছেন। মার্কোস সেনেসিকে তড়িঘড়ি উড়িয়ে আনা হয়েছে। উইং ব্যাক নিকোলাস তাগলিয়াফিকোও পেশির টানে কাবু। আলজেরিয়া ম্যাচে তাঁর খেলা অসম্ভব। স্কালোনির হাতে এখন বাঁ-পায়ের ডিফেন্ডার বলতে একমাত্র ফাকুন্দো মেদিনা। নিকোলাস পাজও ফিজিওথেরাপিস্টের টেবিলেই সময় কাটাচ্ছেন বেশি। তবে স্কালোনির ড্রেসিংরুমে আবহাওয়া যে পুরোটাই মেঘলা, তা নয়। চোট সারিয়ে পুরোদমে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন পারদেস। মাঠে নেমে পড়েছেন নিকোলাস গঞ্জালেসও। তবে এসবই এমিলিয়ানো মার্তিনেজের খবরের সামনে চাপা পড়ে যাবে। হাতের প্লাস্টার কেটে গ্লাভস পরে মাঠে নেমে পড়েছেন দিবু। যদিও মার্তিনেজের চোট পাওয়া হাত নিয়ে এখনই বিশাল কিছু ঝুঁকি নিতে চাইছেন না স্কালোনি। প্রথম ম্যাচে আলভারেজের জায়গায় এই মুহূর্তে ফর্মের তুঙ্গে থাকা লাউতারো মার্তিনেজকেই শুরু করানোর দিকে পাল্লা ভারী স্কালোনির।
ইন্দিও সোলারির শোককে শক্তিতে বদলে দিয়ে, মেসি তাঁর জীবনের শেষ মহাকাব্যের প্রথম পাতাটা কীভাবে লেখেন, কানসাস সিটির এই ঝকঝকে রোদে দাঁড়িয়ে এখন শুধু সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা, সারা পৃথিবীবাসীর।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘বন্ধু’ হলে এত নিষ্ঠুর হত না! ওমানে মার্কিন হামলায় ৩ ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুতে ওয়াশিংটনকে তোপ থারুরের
-
রাজ্যজুড়ে বর্ষার আগমন! উত্তরবঙ্গে ভারী, দক্ষিণে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পূর্বাভাস
-
‘বিজেপি বিরোধী বলেই বিজয়নকে আলিঙ্গন সম্ভব নয়’, রাহুলের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ সিপিএম, ‘ফাটল’ ইন্ডিয়াতে
-
মেলেনি বহু প্রশ্নের সদুত্তর! সই জাল-কাণ্ডে ভবানী ভবনে আজ ফের অভিষেক, তলব কুণালকেও
-
লন্ডনে ভারতীয় বংশোদ্ভুত যুবককে কুপিয়ে খুন! কারণ ঘিরে ধোঁয়াশা
