মারাদোনা, গ্যারি লিনেকাররা না হয় দেখেছিলেন। অনুভব করেছিলেন যুদ্ধের আবহ। কিন্তু মেসি- হ্যারি কেনরা সেই ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় কোথায়? পৃথিবীর আলোও দেখেননি। অদ্ভুতভাবেই পৃথিবীর যে প্রান্তে, যে মুহূর্তে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড মুখোমুখি হয়, ঘুরে ফিরে আসে সেই যুদ্ধের আবহ। সেই উত্তেজনা আর মাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। মাঠের সীমান্ত ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতে। অনেকটা আমাদের ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটীয় যুদ্ধের মতো। আটলান্টার মার্সিডিজ স্টেডিয়ামে মেসির সামনে ইংল্যান্ড আর শুধুই বিশ্বকাপের প্রতিপক্ষ দল নয়। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সেই প্রতিপক্ষ মার্গারেট থ্যাচারের দল। যাদের জন্য ৬৪৯ আর্জেন্টাইন সৈন্য প্রাণ হারিয়েছিল। স্বাভাবিক কারণে হ্যারি কেনদের সামনেও আর্জেন্টিনা শুধুই আর ফুটবল প্রতিপক্ষ নয়, যাদের হারিয়ে ৬৬’র পর ফের বিশ্বকাপ ঘরে আনার প্রয়াস চালানো যায়। বুধবার আটলান্টায় বিশ্বকাপের শুধুই একটি সেমিফাইনালে ম্যাচ নয়। অনুষ্ঠিত হতে চলেছে অন্যরকম এক যুদ্ধ। যে ফুটবল যুদ্ধে জড়িয়ে জাতীয় আবেগও।
বুধবার সেমিফাইনালে ম্যাচের প্রাক্কালে ফকল্যান্ড যুদ্ধের আর্জেন্টিনার প্রবীণ সেনানীদের সংগঠনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতি জারি হয়েছে। বলা হয়েছে, ফুটবল আর যুদ্ধ এক নয়। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল কোনও সশস্ত্র যুদ্ধের জায়গা হতে পারে না। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের প্রতি প্রবীণ সেনানীদের আবেদন– গ্যালারিতে বসে প্রিয় দলকে সমর্থন করার সময় যেন ফকল্যান্ড যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
আরও পড়ুন:

সব কিছু দেখে শুনে মনে হচ্ছে, এ তো ছিয়াশির মারাদোনার সেই অমর ম্যাচের কার্বন কপি। যেখানে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে উঠে মারাদোনা জানিয়েছিলেন, ম্যাচের আগে তাঁদেরকে রাজনীতি আর যুদ্ধের কথা নিয়ে মুখ খোলায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। সত্যিই কি এই হাইভোল্টেজ পরিবেশের মধ্যে তা মেনে চলা সম্ভব? মারাদোনা নিজে বলেছিলেন, ম্যাচ চলাকালীন কিছুতেই ভুলতে পারেননি যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইন সৈনিকদের কথা। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে তারই যেন এক মধুর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন তিনি। এবার মেসি কী করবেন? আশ্চর্য হলেও সত্যি, এই প্রথম ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলতে নামছেন আর্জেন্টাইন তারকা। গত ২১ বছরে একে অপরের বিরুদ্ধে মুখোমুখি হওয়ার সুযোগটাই পাননি। একদিকে পর পর দু’বার বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠে কিংবদন্তী মারাদোনার অক্ষত রেকর্ড ছুঁয়ে দেখার অদম্য প্রয়াস। উল্টোদিকে, যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের প্রতি স্মৃতিতর্পণ আছেই।

মাঠে নেমে মেসিকে মোকাবিলা করার আগেই অন্য এক যুদ্ধে রীতিমতো কাহিল হ্যারি কেনরা। বুধবারের জন্য কোচ টমাস টুখেল তাঁদের জন্য যে পরিকল্পনাই করুন না কেন। ইংল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট তাদের বিশ্বকাপ সফরসূচি নিয়ে যে সবচেয়ে জঘন্য পরিকল্পনা করেছে, তা সেমিফাইনাল ম্যাচ শুরুর আগেই দেখা যাচ্ছে। গ্রুপ থেকে নক আউট। আমেরিকার কোথায় কোথায় ম্যাচ হতে পারে, তার তালিকা তৈরি করে নিজেদের বেসক্যাম্প কানসাসে করার পরিকল্পনা করেছিল আর্জেন্টিনা। দেখা যাচ্ছে, সেমিফাইনাল ম্যাচ খেলতে নামার আগে মেসিরা আপাতত ৮,০২৫ কিলোমিটার পরিভ্রমন করে ফেলেছে। সেখানে ম্যাচ খেলার জন্য আপাতত কত কিলোমিটার জুড বেলিংহ্যামদের ঘুরতে হয়েছে জানেন? ২০,৬০০ কিলোমিটার। আর্জেন্টিনার মতো ইংল্যান্ডও তাদের বেসক্যাম্প করেছে কানসাসে। অদ্ভুতভাবে বিশ্বকাপের একটি ম্যাচও তারা কানসাসে খেলেনি! সঙ্গে আবার যোগ করতে হবে, সমুদ্রপিষ্ঠ থেকে বহু উঁচুতে থাকা মেক্সিকোতে খেলার ধকল। তাহলে ভাবুন মেসিরা যেখানে ঝরঝরে অবস্থায় সেমিফাইনাল খেলতে নামছে, তখন ম্যাচের আগে কতটা ক্লান্তিকর অবস্থার মধ্য রয়েছে ইংল্যান্ড?
ইংল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট তাদের বিশ্বকাপ সফরসূচি নিয়ে যে সবচেয়ে জঘন্য পরিকল্পনা করেছে, তা সেমিফাইনাল ম্যাচ শুরুর আগেই দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, সেমিফাইনাল ম্যাচ খেলতে নামার আগে মেসিরা আপাতত ৮,০২৫ কিলোমিটার পরিভ্রমণ করে ফেলেছে। সেখানে ম্যাচ খেলার জন্য আপাতত কত কিলোমিটার জুড বেলিংহ্যামদের ঘুরতে হয়েছে ২০,৬০০ কিলোমিটার।
এটা ঠিক যে, এই ম্যাচ ঘিরে যতই ফকল্যান্ড যুদ্ধের পটভূমিকা টেনে আনা হোক না কেন, মারাদোনার ৮৬’র সঙ্গে ২০২৬-এ এখন বদলে যাওয়া পৃথিবী। যেখানে মাঠে আবেগের থেকে ফুটবল ল্যাবোটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা গুরুত্ব বেশি। আমেরিকান রেফারি ইসমাইল এলফাত বুধবার আটলান্টা স্টেডিয়ামে কতটা চাপে থাকতে পারে ভাবুন তো। তার উপর গ্যালারিতে আর্জেন্টাইন ফ্যানদের ‘ম্যাচ আন্থেম’ ‘মুচাচোস’ তো আছেই। যে গানে মেসি-মারাদোনার সঙ্গে স্মরণ করা হয় ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত দেশের বীর সেনাদেরও।
View this post on Instagram
ইসমাইল এলফাত মেসিদের জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক হয়েও দেখা দিতে পারেন। মাত্র চার বছর আগে, লুসেইল স্টেডিয়ামে লিও-র হাতে বিশ্বকাপ ওঠার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত নিশ্চয়ই সবাই প্রত্যক্ষ করেছেন। সেই ম্যাচে চতুর্থ রেফারির ভূমিকায় ছিলেন এই ইসমাইল। তবে ম্যাচটা যে সহজ হতে যাচ্ছে না, তা বলাই বাহুল্য। মেসিকে নিয়ে নীল-সাদার ফরোয়ার্ড লাইনে আলভারেজ আর মার্টিনেজকে ধরলে ইংল্যান্ডের আক্রমণটা ভাবুন। কেন আর বেলিংহ্যাম, দু’জনে ছ’টা করে গোল করে ইতিহাস তৈরি করে ফেলেছেন। একদিকে, এমিলিয়ানো মার্টিনেজের অপ্রতিরোধ্য কিপিংয়ের পাশে কীভাবে ফেলে দেবেন পিকফোর্ডের ধারাবাহিকতাকে? পাশাপাশি চোট কাটিয়ে রিস জেমসের দলে ফেরার পর ম্যাচ শুরুর আগেই আর্জেন্টিনাকে লক্ষ্য করে ইংল্যান্ড কোচ টুখেলের হুঙ্কারও খুব বেমানান লাগছে না। যদি বেলিংহ্যামের দিকে তাকান, কী বলবেন? মারাদোনার পর একমাত্র ফুটবলার যিনি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পর পর দুটো ম্যাচে জোড়া গোল করেছে। কেন থাকলেও বেলিংহ্যামই যে স্কালোনির বিনিদ্র রজনী যাপনের মূল কারণ হতে চলেছেন, সেই তথ্য আর নতুন করে কিছু বলার নেই।
৬৬’র পর ইংল্যান্ডের ট্রফি ক্যাবিনেটে ‘বিশ্বকাপ’ নামক শব্দটার উপর চিরকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে গিয়েছে। ষাট বছর পেরিয়ে গিয়েছে। শুধুই ট্রফির দিকে তাকিয়ে থেকেছে ইংল্যান্ড। পাশাপাশি এই আটলান্টাতেই ঘটে যেতে পারে ফুটবল ঈশ্বরের বিশ্বকাপ মঞ্চে পদস্পর্শ পাওয়ার অন্তিম মুহূর্ত। একদল কাঁদতে কাঁদতে দেশের বিমান ধরবে। আরেকদল নিউ জার্সির বিমান ধরবে। সময়ের নিরিখে একদিন ইতিহাসের এই ক্ষতও হয়তো সেরে যাবে। কিন্তু ইতিহাস মুছবেন কী করে? মেসিরা পরপর দু’বার ফাইনালে উঠে মারাদোনার রেকর্ড স্পর্শ করতে পারেন নাকি কেনরা ট্রফি জয়ের আরও কাছে পৌঁছন, উত্তর দেবে আটলান্টা।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
প্রথম শ্রেণির পড়ুয়াকে ‘মুখমেহনে’ চাপ, বাংলার স্কুলেই যৌন হেনস্তার শিকার ছাত্র
-
লগ্নির জগতে নতুন দিশা দেখাচ্ছে স্পেশালাইজড ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড, জেনে নিন খুঁটিনাটি
-
আসন পুনির্বিন্যাস বিল সমর্থন করবে শরদ পওয়ারের দল! NDA যোগ নিয়েও মুখ খুললেন সুপ্রিয়া সূলে
-
হালান্ডের দেশের ক্লাবকে ১৩ গোল, ভারতের বিশ্বকাপ হা-হুতাশে আশার আলো মিনার্ভা অ্যাকাডেমি!
-
সেমির আগে যুদ্ধং দেহি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সমর্থকরা! আটলান্টা যেন দুর্গ, মোতায়েন হাজারো নিরাপত্তাকর্মী
