বোস্টনের বেন্টলি ইউনিভার্সিটিতে যেখানে এমবাপেরা (Mbappe) বেস ক্যাম্প করেছেন, শহরটির আবহাওয়া এবং পরিবেশ অনেকটাই ইউরোপের মতো। সাধে কী আর এই অঞ্চলটিকে ‘নিউ ইংল্যান্ড’ বলে অভিহীত করা হয়। চার্লস নদীর মৃদু হাওয়া, শান্ত নির্জন রাস্তাঘাট, আর চারিদিকের ঐতিহাসিক পরিবেশ, সব মিলিয়ে ফুটবলারদের বেসক্যাম্প করার জন্য আদর্শ পরিবেশ। হয়তো সেই কারণেই নিজেদের বেস ক্যাম্প করার জন্য বোস্টনকেই বেছে নিয়েছেন এমবাপেরা।
এই বিষয়ে আরও খবর
ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন কর্তারা হয়তো সেই কারণেই ভেবেছিলেন, এই শান্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরিবিলি পরিবেশে এমবাপেরা নিজেদের অনায়াসে গুছিয়ে নিতে পারবেন। বোস্টন হল আমেরিকার ইতিহাসের সূতিকাগার। ১৭৭৩-এ ‘বোস্টন টি পার্টি’ ব্রিটিশ শাসনের একেবারে ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস যেখানে বিপ্লবের কথা বলে, সেখানে বিতর্ক ছড়াবে না, তা কী করে হয়! তার উপর দলটার নাম ফ্রান্স। সে বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) হোক, কিংবা ইউরোপিয়ান কাপ। ফ্রান্স শিবিরে একটা না একটা গন্ডগোল লেগেই থাকবে। আর তার কোনওটাই ফুটবল সম্পর্কিত বিষয়ের জন্য নয়। কোনওটায় রাজনীতি, কোনওটায় স্পনসরশিপ। আর নেতৃত্বে অবশ্যই ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপে। আমেরিকা বিশ্বকাপে এসেই বা তার অন্যথা হয় কী করে?

বোস্টনের ফোর সিজনস হোটেলের বাইরে যখন ফরাসি সমর্থকরা ‘আল্লে লে ব্লুজ’ বলে চিৎকার করছেন, তখন ভেতরের অলিন্দে কিন্তু ইমেজ রাইটস, উগ্র ডানপন্থা আর এমবাপের ফর্মের ত্র্যহস্পর্শ। সেনেগাল, ইরাক বা নরওয়ের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর চেয়েও ফ্রান্সকে এখন বেশি লড়তে হচ্ছে নিজেদের ভেতরের বিতর্কের সঙ্গে। আর তা শুধু দেশের সংবাদমাধ্যম কেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাংবাদিকদের কাছেও এখন হাতে গরম খবর, ফ্রান্স শিবিরের ঝামেলা।
চার বছর আগে এমবাপেকে নিয়ে কাতার বিশ্বকাপের ঘটনার কথা নিশ্চয়ই বিস্মৃত হয়ে যায়নি পাঠককুল। ম্যাচের সেরা হয়েও সাংবাদিক সম্মেলনে আসতেন না, শুধুমাত্র সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে বলে। নিয়ম ভাঙায় দিনের পর দিন জরিমানা দিয়েছেন ফিফাকে। তবুও নিজের জায়গা থেকে সহজে পিছিয়ে যাননি। ফিফার স্পনসর হিসেবে মদের কোম্পানির নাম দেখা যাবে বলে ম্যাচের সেরার পুরস্কার উলটো করে ধরে ফিফার চক্ষুশূল হয়েছেন। তবু সিদ্ধান্তে অনড়। এহেন এমবাপে যে ফরাসি শিবিরে কোনও নিয়মভঙ্গ হল বিদ্রোহের আগুন জ্বালাবেন, বলাই বাহুল্য। বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করার আগে সেটাই ঘটেছে ফরাসি শিবিরে। শুরু হয়ে গিয়েছে নাটক। আর শুরুটা হয়েছে ছবির স্বত্ব নিয়ে।
ঘটনাটা হল, ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের অনুমোদিত একটি বেটিং সংস্থা, ‘বেটফ্লিক’ ফুটবলারদের ছবি ব্যবহার করে বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপনী প্রচার শুরু করেছিল। ব্যস, তাতেই মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছে অধিনায়ক এমবাপের। সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, জুয়া বা ফাস্ট ফুডের বিজ্ঞাপনে নিজের বা দলের কোনও ফুটবলারদের মুখ তিনি ব্যবহার করতে দেবেন না। এর পিছনে একটাই কারণ, সংস্থাটি বিজ্ঞাপন তৈরির আগে ফুটবলারদের আগাম কোনও অনুমতি নেয়নি। শুধুমাত্র এই যুক্তির ভিত্তিতে নিজেদের ফেডারেশনকে এমনভাবে ফরাসি অধিনায়ক চেপে ধরেছেন, বিশ্বকাপ শুরুর মুখে ফেডারেশন কর্তারা রীতিমতো কোণঠাসা। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই, এই কর্পোরেট যুদ্ধ দলের ফোকাস নষ্ট করছে কি না, সেই প্রশ্নই এখন ফরাসি সংবাদমধ্যমগুলির কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তবে শুধুই ছবির স্বত্ব নয়। ফরাসি ড্রেসিংরুমে সেদেশের রাজনীতির ছাপ পড়বে না, এরকমটা নৈব নৈব চ।
ফরাসি ড্রেসিংরুম মানেই ফুটবল আর রাজনীতির সেই চিরন্তন ককটেল। ফ্রান্সে সামনেই নির্বাচন, তবে আমাদের দেশের জল বুঝে, জল মেপে পা ফেলার মতো আচরণে অভ্যস্ত নন এমবাপে। স্রেফ মন থেকে পছন্দ করেন না বলেই উগ্র-ডানপন্থীদের উত্থান নিয়ে প্রকাশ্যেই তোপ দেগে বসে আছেন ফরাসি সুপারস্টার। শুধুই নিজের পছন্দের দলের প্রতি তার সম্মতির কথা জানিয়েই ক্ষান্ত হননি। একই সঙ্গে দেশবাসীকে চরমপন্থার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েও বসে আছেন কিলিয়ান এমবাপে।

বিশ্বকাপ অভিযানের মধ্যেই ফুটবলারদের কি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নিজেদের মনোযোগের বারোটো বাজানো উচিত? ব্যস, এই বিষয়টি নিয়েই ফরাসি মিডিয়া আপাতত দু’ভাগে বিভক্ত। কোচ দিদিয়ের দেশঁ অবশ্য তাঁর প্রিয় ছাত্রের মতো প্রকাশের স্বাধীনতাকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে দিলেও, অন্য প্রাক্তন ফুটবলাররা ছাড়বেন কেন? এমবাপের আচরণে রে রে করে সমালোচনা করে উঠেছেন ফরাসি কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনি, সঙ্গে অন্য প্রাক্তন ফুটবলাররাও।
প্লাতিনির মতে, দেশের অধিনায়কের নিরপেক্ষ থাকা উচিত। বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিযোগিতায় মাঠে নামার আগে কেন দলের অধিনায়ক তাঁর নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে ঢক্কানিনাদ জুড়বেন?
আর এরই প্রভাব পড়েছে সংবাদমাধ্যমের উপর। বিশ্বকাপ শুরুর মুখে হাতের কাছে গরমা গরম স্টোরি। ফলে প্র্যাকটিসের পর প্রতিদিনের নিয়ম মাফিক প্রেস কনফারেন্সে ফরাসি সংবাদমাধ্যমের তরফে ট্যাকটিক্স, দলের ফর্মেশন এসব নিয়ে আর কঠিন কঠিন প্রশ্ন আসছে না। বরং ফুটবলের সাংবাদিক সম্মেলনে সংবাদমাধ্যমের তরফে উগ্র-ডানপন্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বেশি। আর তা ঢাল হয়ে সামলাতে হচ্ছে কোচ দিদিয়ের দেশঁকেই।
তার উপর মরার ঘায়ে খাড়ার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে এমবাপের সাম্প্রতিক ফর্ম। প্রস্তুতি ম্যাচে আইভরি কোস্টের কাছে হার বা উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ছন্নছাড়া জয়, ফরাসি সংবাদমাধ্যমের কেউই বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছে না। সঙ্গে বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্ মুহূর্তে কাউকে না জানিয়ে হঠাতই ব্যক্তিগত কারণে এমবাপের রিয়াল মাদ্রিদে উড়ে যাওয়া নিয়েই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। দলের বাকিরা যখন একাগ্র চিত্তে বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছিলেন, ঠিক সেই সময়েই সংবাদপত্রে এমবাপের ছুটি কাটানোর ছবি প্রকাশ হতেই ফরাসি ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ মনে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, এমবাপের মন কি সত্যিই বিশ্বকাপে আছে, নাকি মাদ্রিদের নতুন ঠিকানাতেই আটকে?
সঙ্গে আবার, কোচ দিদিয়ের দেশঁ-র বিদায়বেলার গুঞ্জন। হয়তো এটাই কোচ হিসেবে দেশঁ-র শেষ বিশ্বকাপ। ফলে গুঞ্জন তো তৈরি হবেই। আর আশঙ্কাটা সেখানেই। ফরাসি ফুটবলে বহুবার এরকম হয়েছে, অসাধারণ দল নিয়েও মাঠের বাইরের ঘটনায় নাক গলিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে বিদায় নিতে হয়েছে ফ্রান্সকে। আমেরিকার মাটিতে এরকম কিছু না হলেই মঙ্গল ফরাসি সমর্থকদের জন্য।
এই বিষয়ে আরও খবর
সর্বশেষ খবর
-
ছাব্বিশে ফিরল ʼ১৪-র স্মৃতি, ৭ গোল দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু জার্মানির
-
সই জাল কাণ্ডে কুণাল-অভিষেককে মুখোমুখি জেরা, বয়ানে অসংগতি সাংসদের! ফের তলবের ভাবনা সিআইডির
-
লেবানন নিয়ে ইজরায়েল-ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা, ‘আমরা শান্তির দোরগোড়ায়’, বার্তা ট্রাম্পের
-
ক্রিকেট মাঠে ফের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ ভারতের, পাকিস্তানকে উড়িয়ে বিশ্বকাপ শুরু স্মৃতি-দীপ্তিদের
-
হাতের সঙ্গে জুড়ছে মমতার তৃণমূল? জল্পনার মাঝেই ২১ জুলাই ‘শহিদ তর্পণে’ রাহুলকে আনার প্রস্তুতি প্রদেশ কংগ্রেসের




