রাত জেগে ম্যাচ দেখা। কখনও বা ভোরে উঠে। ভারতীয় ফুটবল ভক্তদের কষ্ট আর ক’জন বোঝে? ও বাবা! এখন তো আবার দু’টো করে ম্যাচ একসঙ্গে। একটা টিভিতে, একটা হয়তো মোবাইলে। এভাবেই চলছে। নিশ্চয়ই খেয়াল করে দেখেছেন, গ্রুপের শেষ দু’টো ম্যাচকে একই সময়ে রাখা হয়। কিন্তু ছবিটা আগে এরকম ছিল না। নিয়ম বদলায় একটি বিশেষ ম্যাচের পর। যে ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসে পরিচিত ‘গিজনের কলঙ্ক’ নামে। প্লেয়ারদের উদ্দেশে ডিম ছোড়া থেকে নিজেদের দেশের পতাকা পোড়ানো। উঠেছিল গড়াপেটার অভিযোগও। কী না ঘটেছিল সেই ম্যাচে! আর ইতিহাসের কী অদ্ভুত সমাপতন। সেদিনের ‘কলঙ্কিত’ ম্যাচে যারা জড়িত ছিল, এবারের বিশ্বকাপে (FIFA World Cup) একটু এদিক-ওদিক করে সেই আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে।
ঘটনা শুরু থেকেই বলা যাক। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ (FIFA World Cup) হয়েছিল স্পেনে। ‘গ্রুপ ২’-এর শেষ ম্যাচ ছিল স্পেনের শহর গিজনে। মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রিয়া ও পশ্চিম জার্মানি। ওই গ্রুপে আর ছিল আলজেরিয়া ও চিলি। তিন ম্যাচের তিনটেতেই হেরে ছিটকে গিয়েছে চিলি। সেবার আলজেরিয়া দারুণ ফর্মে ছিল। প্রথম ম্যাচে পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিল তারা। সেই প্রথম আফ্রিকান বা আরব দেশীয় দল বিশ্বকাপে কোনও ইউরোপীয় দলকে পরাজিত করেছিল। পরের ম্যাচে তারা অস্ট্রিয়ার কাছে হেরে যায় ০-২ গোলে। শেষ ম্যাচে চিলির বিরুদ্ধে জেতে ৩-২ গোলে। অর্থাৎ ৩ ম্যাচে পয়েন্ট ৪ (তখন ম্যাচ জিতলে ২ পয়েন্ট মিলত)। গোল পার্থক্য ০। গ্রুপে দ্বিতীয় স্থানে।
আরও পড়ুন:

অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার ২ ম্যাচে পয়েন্ট ৪। গোল পার্থক্য +৩। তৃতীয় স্থানে পশ্চিম জার্মানি। ২ ম্যাচে ২ পয়েন্ট। গোল পার্থক্য +২। গ্রুপ থেকে দু’টি দল পরের রাউন্ডে যাবে। ম্যাচ বাকি একটাই- অস্ট্রিয়া বনাম পশ্চিম জার্মানি। তাহলে অঙ্কটা কী দাঁড়াল? অস্ট্রিয়া জিতলে বা ড্র করলে তারা ও আলজেরিয়া নকআউটে যাবে। সুবিধা হল- হেরে গেলেও তারা পরের রাউন্ডে যেতে পারবে। কিন্তু পশ্চিম জার্মানি ২ গোলের বেশি ব্যবধানে জিতলে মুশকিল। যদি পশ্চিম জার্মানি ৩ গোলের ব্যবধানে জেতে, তাহলে তিন দলের পয়েন্ট দাঁড়াবে ৪। কিন্তু গোল পার্থক্যে সবার আগে চলে যাবে কার্ল হাইঞ্জ রুমেনিগের দল। অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার গোল পার্থক্য হবে ০। কিন্তু আলজেরিয়া বেশি গোল করেছে। তাই পরের রাউন্ডে তারা যাবে। আর যদি ৩-এর বেশি গোলে জেতে, তাহলে অস্ট্রিয়ার গোল পার্থক্য হবে -১। সেক্ষেত্রে পশ্চিম জার্মানি ও আলজেরিয়া পরের রাউন্ডে যাবে।

নি:সন্দেহে জটিল অঙ্ক। মোদ্দা কথা, অস্ট্রিয়া ২ গোলের কমে ম্যাচ হারলে আলজেরিয়া বাইরে। এই অঙ্ক নিয়ে বিশ্বকাপে নামল ইউরোপের দুই দেশ। যাদের ভাষা এক। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও প্রচুর মিল। আর সরু সুতোর উপর ঝুলছে এক অপ্রত্যাশিত দলের ভাগ্য। গিজনের এল মোলিনোন স্টেডিয়ামে সেদিন দর্শক ছিল ৪১০০০। সেখানে পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রিয়ার দর্শকরা তো ছিলেনই। হাজির ছিলেন আলজেরিয়ার সমর্থকরাও। স্পেনের প্রচুর মানুষও এসেছিলেন ম্যাচটা দেখতে। স্কটিশ রেফারি বব ভ্যালেন্টিন শুরুর বাঁশি বাজাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে পশ্চিম জার্মানি। মুহুর্মুহু আক্রমণে দিশেহারা অস্ট্রিয়ার দুর্গ। ঠিক ১১ মিনিটে হোর্স্ট হ্রুবেস্ক গোল করেন। এই ফলাফলে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া পরের রাউন্ডে। আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে, কেউ আর কোনও গোলের চেষ্টা করল না। নিজেদের মধ্যে অনর্থক পাস খেলছে। গোলমুখে আক্রমণ নেই। ঠিকঠাক বল রিসিভ করছে না। এমনকী কেউ কাউকে ফাউলও করছে না। যদি হলুদ কার্ড দেখে ফেলি!

কিছুক্ষণ খেলা গড়াতেই দর্শকরা বুঝে গেলেন কী হতে চলেছে। তারপরই শুরু হল ধিক্কার। দর্শকরা বলতে লাগল, ‘নিজেদের মধ্যে চুমু খেয়ে নাও।’ টাকা ছোড়া হল ফুটবলারদের উদ্দেশে। এমনকী ধারাভাষ্যকারও শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘দয়া করে এই ম্যাচটা আর দেখবেন না।’ ম্যাচই শেষ হল সেই ১-০ গোলে। ছিটকে গেল আলজেরিয়া। উঠল গড়াপেটার অভিযোগ। ম্যাচের পর যখন পশ্চিম জার্মানির ফুটবলাররা হোটেলে ফিরছিলেন, তখন তাঁদের উদ্দেশে উড়ে এল ডিম। এমনকী নিজেদের পতাকাও পোড়ায় পশ্চিম জার্মানির ভক্তরা। অন্যদিকে আলজেরিয়া ফুটবল ফেডারেশন ফিফার কাছে প্রতিবাদ জানায়। তাদের বক্তব্য, রেফারির উচিত ছিল ম্যাচে হস্তক্ষেপ করা। কিন্তু পালটা পশ্চিম জার্মানির কোচ জাপ ডেরওয়াল দাবি করেন, তাঁদের দু’জন ফুটবলার চোটগ্রস্ত ছিলেন। তাই আর তাঁরা ঝুঁকি নেননি। শেষমেশ জার্মানি ফাইনালে হারে ইটালির কাছে। ওই বিশ্বকাপে স্পেনের আরেকটি ম্যাচেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেটা নিয়ে আর তত আলোচনা হয়নি। যাই হোক, এর পরের বছরই নিয়ম বদলাতে হয় ফিফা। তারপর থেকে গ্রুপের শেষ ম্যাচগুলো একসময় হয়।

ঠিক একই ঘটনা ফিরতে পারে এবারও। ৪৪ বছর পুরনো ইতিহাস ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে লিওনেল মেসিদের গ্রুপে। এবারও জড়িয়ে সেই দু’টো নাম- আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া। ‘জে’ গ্রুপ থেকে ইতিমধ্যে রাউন্ড অফ ৩২-এ চলে গিয়েছে আর্জেন্টিনা। এই গ্রুপে এরপর আছে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া। দু’ম্যাচে দু’দলেরই পয়েন্ট ৩। গোল পার্থক্যে আপাতত দ্বিতীয় স্থানে অস্ট্রিয়া। ফলে পরের ম্যাচে ১ পয়েন্ট পেলেও তারা পরের রাউন্ডে যাবে। আবার আলজেরিয়া জিতলে তারা দ্বিতীয় হবে। ড্র হলে ৪ পয়েন্ট হবে। যেহেতু এবার গ্রুপে তৃতীয় দলও পরের রাউন্ডে যেতে পারে, তাই হারলেও ৩ পয়েন্টে সুযোগ থাকবে দু’দলের কাছেই। এখানেই শুরু অঙ্কের খেলা। যদি অস্ট্রিয়া জেতে বা ড্র করে, তাহলে তারা এই গ্রুপে দ্বিতীয় হবে। সেক্ষেত্রে রাউন্ড অফ ৩২-এ তাদের প্রতিপক্ষ হবে ‘এইচ’ গ্রুপের সেরা দল। ‘এইচ’ গ্রুপে কে শীর্ষে শেষ করেছে জানেন? স্পেন। কোনও দলই সম্ভবত চাইবে না ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মুখোমুখি হতে।

এবার যদি ‘জে’ গ্রুপে তৃতীয় হয়, তাহলে প্রতিপক্ষ হবে ‘বি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন। সেটা হল সুইজারল্যান্ড। তবে প্রতিপক্ষ বদলাতে পারে। যাই হোক না কেন, হয়তো আলজেরিয়া বা অস্ট্রিয়া কোনও দলই চাইবে না গ্রুপে দ্বিতীয় হতে। আপাতত তৃতীয় স্থানে থাকা আলজেরিয়া হয়তো চাইবে ড্র করতে বা হেরে যেতে। যাতে ৪ বা ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়েই পরের রাউন্ডে যেতে পারে। আর অস্ট্রিয়া সম্ভবত চাইবে হেরে যেতে। যাতে পয়েন্ট তালিকায় আলজেরিয়া উঠে আসে। আর তারা তৃতীয় হয়ে যায়। আর এই জটিলতায় বাড়ছে গড়াপেটার আশঙ্কাও। আর ফিরছে ‘গিজনের কলঙ্কে’র আশঙ্কা। সেই ইতিহাস কী ফিরছে? নাকি আলজেরিয়া জিতে সেই ‘অন্যায়ে’র বদলা নেবে?
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
জামিনে বাড়ি ফিরতেই বিবাদ! খাস কলকাতায় ‘খুনে’র অভিযোগে গ্রেপ্তার দম্পতি
-
বিশ্বকাপে হেরেও অলিম্পিকের টিকিট স্মৃতিদের, এখনও অনিশ্চিত শ্রেয়সরা, কী মাপকাঠি জানাল আইসিসি?
-
‘ইটালীয় মানসিকতার কোনও…’, সোনিয়াকে খোঁচা বিজেপির, পালটা জবাব কংগ্রেসের
-
এবার সব্যসাচীর বিরুদ্ধে তদন্তে ইডি! ‘বান্ধবী’র বাড়ি থেকে সোনা উদ্ধারের পর মামলার নথি সংগ্রহ
-
দ্রাবিড়ভূমই পাখির চোখ, তেলেঙ্গানায় পদ্ম ফোটাতে হারদরাবাদ পুরভোটে ঘুঁটি সাজাচ্ছে বিজেপি
