Advertisement
Advertisement
FIFA World Cup 2026

ক্ষমতাবানরাই চ্যাম্পিয়ন! ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ বারবার দখল করেছেন হিটলারের মতো একনায়করা

সাম্প্রতিক অতীতেও রয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো 'একনায়ক'দের উদাহরণ।

Advertisement
অণ্বেষা অধিকারী
অণ্বেষা অধিকারী

শেষ আপডেট: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৯:১৭

link
অণ্বেষা অধিকারী
অণ্বেষা অধিকারী

শেষ আপডেট: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৯:১৭

options
link
ক্ষমতাবানরাই চ্যাম্পিয়ন! ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ বারবার দখল করেছেন হিটলারের মতো একনায়করা zoom
যুগে যুগে এই বিশ্বকাপের সঙ্গেই ছায়ার মতো জড়িয়ে রয়েছেন অ্যাডলফ হিটলার-বেনিতো মুসোলিনিদের নাম।

ফুটবল বিশ্বকাপ। ৯৬ বছর ধরে চলে আসা মেগা টুর্নামেন্টে লেখা হয়েছে বহু রূপকথা। স্বপ্নপূরণ, স্বপ্নভঙ্গ, তারকাদের মুখ থুবড়ে পড়া, নতুন তারাদের উত্থান, ফুটবলার থেকে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা-কত কিছুরই সাক্ষী থেকেছে এই বিশ্বকাপ। ভারত কোনওদিন বিশ্বকাপে না খেললেও পেলে-মারাদোনাদের বিশ্বকাপের কাহিনি এদেশের ফুটবলপ্রেমীদের ঠোঁটস্থ। কিন্তু যুগে যুগে এই বিশ্বকাপের সঙ্গেই ছায়ার মতো জড়িয়ে রয়েছেন অ্যাডলফ হিটলার-বেনিতো মুসোলিনিদের নাম। মনে করা হয়, মাঠের যুদ্ধে যে দলই নামুক না কেন, পর্দার আড়ালে আসল চ্যাম্পিয়ন এই একনায়করাই। বিশ্বকাপের বয়স প্রায় ১০০ ছুঁইছুঁই। এই দীর্ঘ সময়কালে বারবার মেগা টুর্নামেন্টে ফিরে এসেছে একনায়কতন্ত্রের করাল ছায়া।

১৯৩৪। দ্বিতীয়বার বসছে ফুটবল বিশ্বকাপের আসর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে ইউরোপে। একের পর এক দেশে একনায়কতন্ত্রের উত্থান। ব্যতিক্রম নয় ইটালিও। বেনিতো মুসোলিনির ক্ষমতায় তখন গোটা দেশ মাথা নুইয়েছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মুসোলিনির একনায়কতন্ত্রের সমালোচকদের সংখ্যাও। ঠিক সেসময়ে মেঘ না চাইতেই জল। খানিকটা গায়ের জোরে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব আদায় করে নেন মুসোলিনি। কোনও বড়মাপের আলোচনা, ভোটাভুটি ছাড়াই ১৯৩২ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, দু’বছর পর বিশ্বকাপের আসর বসবে ইটালিতেই। মুসোলিনির লক্ষ্য দু’টো- গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দেবেন তাঁর নেতৃত্বে ইটালি কতখানি শক্তিশালী, আর দেশবাসীও নেতা হিসাবে মুসোলিনিকে পেয়ে ধন্য।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

বিশ্বকাপ উপলক্ষে একের পর এক পদক্ষেপ করেছিলেন ইটালির কুখ্যাত একনায়ক। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য চালু করেন বিশেষ ট্রেন, স্টেডিয়ামে দর্শকাসন বাড়ানো হয়। সেসময়ে দেশজুড়ে অন্তত ৩ লক্ষ পোস্টার বিলি করে মুসোলিনির প্রশাসন। দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও আমজনতার মতো লাইনে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছিলেন মুসোলিনি স্বয়ং। তবে এতকিছুর আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছিল নৃশংস শাসকের চোখরাঙানি। সেবার বিশ্বকাপ জেতে ইটালি। কিন্তু পরে জানা যায়, ফুটবলারদের রীতিমতো হুমকি দেওয়া হত। জিততে না পারলে প্রাণ যাবে, মুসোলিনির এমন হাড়হিম করে দেওয়া টেলিগ্রাম পৌঁছে যায় ফুটবলারদের কাছে। প্রত্যেকটা ম্যাচে মুসোলিনিকে স্যালুট করতে বাধ্য হতেন ফুটবলাররা। শেষ পর্যন্ত ইটালির জয়ে মুসোলিনির ছাতি চওড়া হয়েছিল, কিন্তু ফুটবলারদের ভয়-কান্না চাপা পড়ে গিয়েছিল সেই দম্ভে।

আগ্রাসী ফ্যুয়েরারের থাবা পড়ে অস্ট্রিয়ার উপর। ১৯৩৮ সালের ১২ মার্চ অস্ট্রিয়ার ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ল জার্মান সেনা। জার্মানির সঙ্গে মিশে গেল অস্ট্রিয়া, ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হল আনশলুস অধ্যায়। অস্ট্রিয়ার ‘বিশুদ্ধ আর্য’ ফুটবলারদের বেছে নিয়ে জার্মান ব্রিগেডে ঢুকিয়ে দিল হিটলারের প্রশাসন।

একনায়কদের তালিকায় হিটলারের নাম থাকবে না, সেটা তো অসম্ভব। ‘বন্ধু’ মুসোলিনির বিশ্বজয়ের পর নাৎসি শাসকেরও মনে হল, বিশ্বকাপকে কাজে লাগানো দরকার। তাই ১৯৩৮ বিশ্বকাপকে পাখির চোখ করলেন ‘বিশুদ্ধ আর্য’ রক্তের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মঞ্চ হিসাবে। তবে টুর্নামেন্ট আয়োজনের অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারেননি হিটলার। ফ্রান্সে বসে বিশ্বকাপের আসর। তার কয়েকমাস আগেই আগ্রাসী ফ্যুয়েরারের থাবা পড়ে অস্ট্রিয়ার উপর। ১৯৩৮ সালের ১২ মার্চ অস্ট্রিয়ার ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ল জার্মান সেনা। জার্মানির সঙ্গে মিশে গেল অস্ট্রিয়া, ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হল আনশলুস অধ্যায়। অস্ট্রিয়ার ‘বিশুদ্ধ আর্য’ ফুটবলারদের বেছে নিয়ে জার্মান ব্রিগেডে ঢুকিয়ে দিল হিটলারের প্রশাসন। মিলিজুলি দল নিয়ে বিশ্বকাপে নেমে পড়ল জার্মানি। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার যুদ্ধে সুইজারল্যান্ডের কাছে ২-৪ ফলে হার। বিশ্বকাপ হাতছাড়া হতে হিটলারের যাবতীয় রাগ গিয়ে পড়ে ফুটবলারদের উপর।

বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে বিশ্বকাপে একনায়কতন্ত্রের ‘ধারা’ বহন করেছেন ব্রাজিলের সামরিক শাসক জেনারেল এমিলিও গারাস্তাজু মেদিচি। ১৯৬৯ সালে ব্রাজিলে ক্ষমতা দখল করেন তিনি। পরের বছরই মেক্সিকোয় বিশ্বকাপের আসর। ততদিনে দু’বার বিশ্বকাপ জিতে গিয়েছে সেলেকাও। তৃতীয় ট্রফিতে ব্রাজিলে আনতেই হবে, এই পরিকল্পনায় কোমর বাঁধলেন এমিলিও। তবে হিটলার-মুসোলিনিদের মতো ভয় দেখিয়ে নয়, এমিলিও বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেছিলেন নরমভাবে। তাঁর সামরিক শাসনে ব্রাজিলকে বিরোধীশূন্য করে তোলার প্রচেষ্টা চলছিল-এমন অপবাদ ঘোচাতে বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেন এমিলিও। কমিউনিস্ট হওয়ার ‘অপরাধে’ পেলেদের কোচ জোয়াও সালডানহাকে সরিয়ে দেন। তারপর বিশ্বকাপে দুরন্ত পারফর্ম করে চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। সেই জয়কে সুকৌশলে এমিলিওর নিজের জয় বলেই প্রচার চলে ব্রাজিলজুড়ে। যাবতীয় বিরোধিতা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ চাপা পড়ে যায় বিশ্বজয়ের জৌলুসে।

ফুটবলকেই নিজের অন্যতম সেরা অস্ত্র করে তোলেন মোবুতু। তাঁর ইচ্ছা, ঔপনিবেশিক অতীত ভুলে কঙ্গো এক শক্তিশালী দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করুক। তাঁর কাছে ফুটবল ছিল শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ।

ফুটবলে সাফল্য পেতে মরিয়া হয়ে ওঠা আরেক একনায়কের নাম মোবুতু সেসে সেকো। আফ্রিকা মহাদেশের একনায়কদের তালিকায় অন্যতম এই মোবুতু। ১৯৬৫ সালে মোবুতু যখন ক্ষমতায় এলেন, কঙ্গো তখন গৃহযুদ্ধে টালমাটাল। সেসময় ফুটবলকেই নিজের অন্যতম সেরা অস্ত্র করে তোলেন মোবুতু। তাঁর ইচ্ছা, ঔপনিবেশিক অতীত ভুলে কঙ্গো এক শক্তিশালী দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করুক। তাঁর কাছে ফুটবল ছিল শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ। আফ্রিকার ফুটবলে উল্কার মতো উত্থান হয় কঙ্গোর। কিন্তু বিশ্বকাপে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে কঙ্গোর স্বপ্নের দৌড়। প্রথম ম্যাচে হার, ফুটবলারদের বেতন বন্ধের নির্দেশ মোবুতুর। দ্বিতীয় ম্যাচে কঙ্গো খেয়েছিল ৯ গোল।

সাধের ফুটবল দলের এমন হতশ্রী পারফরম্যান্স দেখে মোবুতু সটান চলে আসেন ড্রেসিংরুমে। ম্যাচ হেরে বিধ্বস্ত টিমকে আলটিমেটাম দিয়ে দেন। জানিয়ে দেন পরের ম্যাচটা যদি তিন গোলের বেশি ব্যবধানে হারে তাহলে গোটা দলকে আর দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না। শেষপর্যন্ত ব্রাজিলের কাছে ৩-০ ফলেই হারে কঙ্গো। দেশে ফিরলেও ফুটবলারদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তাঁদের। ফুটবলকে ব্যবহার করে নিজের ‘দোষ ঢাকার’ যে নজির মুসোলিনিরা দেখিয়েছিলেন, সেটা করতে না পেরে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মোবুতু। নির্দেশ দেন, দেশ ছেড়ে কোনওদিন কোথাও যেতে পারবেন না ফুটবলাররা।

নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ আয়োজন করে বিশ্বের দরবারে সুখ্যাতি কুড়ানো, দেশের সমস্যা থেকে নজর ঘোরানো, আন্তর্জাতিক দরবারে নিজেদের বদনাম ঘোচানো-দেশ নির্বিশেষে সকলেরই ছিল এই একই উদ্দেশ্য।

একনায়কদের তালিকায় আরেক উল্লেখযোগ্য নাম জেনারেল জোর্গে ভিদেলা। ১৯৭৬ সালে আর্জেন্টিনার ক্ষমতা দখল করেন। তার দু’বছর পরেই বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্বে ছিল আর্জেন্টিনা। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ, সেখানে দল ব্যর্থ হবে? সেটা যেকোনও মূল্যে আটকাতে বদ্ধপরিকর ছিলেন ভিদেলা। প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে বসেই দেশজুড়ে কার্যত সন্ত্রাসের রাজত্ব চালিয়েছিলেন ভিদেলা। আমজনতা এবং মূলত বামপন্থীদের অপহরণ করে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো, প্লেনে চাপিয়ে মাঝসমুদ্রে ছুড়ে ফেলার মতো ভয়ংকর অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। অন্তত ৩০ হাজার মানুষ অপহৃত হয়েছিলেন এই সামরিক শাসনকালে। সেসব অভিযোগ মুছতে মারিও কেম্পেসদের রীতিমতো চাপ দিয়েছিলেন ভিদেলা, এমনটাই শোনা যায়। এমনকী পেরুকে ৩৫ হাজার টন খাদ্যশস্য এবং ৫০ মিলিয়ন ডলারে ‘ঘুষ’ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়কে একেবারে ব্যক্তিগত সাফল্যের মতো উদযাপন করেছিলেন ভিদেলা।

সাম্প্রতিক অতীতেও রয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ‘একনায়ক’দের উদাহরণ। নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ আয়োজন করে বিশ্বের দরবারে সুখ্যাতি কুড়ানো, দেশের সমস্যা থেকে নজর ঘোরানো, আন্তর্জাতিক দরবারে নিজেদের বদনাম ঘোচানো-দেশ নির্বিশেষে সকলেরই ছিল এই একই উদ্দেশ্য। বিশ্বকাপটা ফুটবলের হলেও, মাঠের বাইরে রাজনীতির খেলা চলে আরও জোরকদমে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.