ব্রাজিল সমর্থক হয়েও ’৯৪-এর ফুটবল বিশ্বকাপ দেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন অনেকে। সেবার ব্রাজিল বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হলেও আনন্দ করেননি তাঁরা। কারণটা বিশ্বের ফুটবল ময়দানের ‘চিরশত্রু’ দেশের এক ফুটবলার, দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা (Diego Maradona)। এবং গল্পের শুরুটা সেই বিশ্বকাপ থেকেই।
এই বিষয়ে আরও খবর
গ্রিসের বিরুদ্ধে তাঁর গোল, পাশের বাড়ির ছেলেটার মতো তাঁর সেলিব্রেশন যেন আমাদের মতো বিশ্বকাপ না খেলা দেশের আর্জেন্টিনা সমর্থকদেরও। অনেক ভারতীয়-ব্রাজিলীয়রাও সেদিন আনন্দে শামিল হয়েছিলেন। কারণ প্রিয় দল ব্রাজিল হলেও প্রিয় প্লেয়ার মারাদোনা। তখন কে জানত, অমন ট্র্যাডিজি ঘটে যাবে! অথচ নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি ফিরেছিলেন। সেই ’৯১-এর মার্চে এসএসসি বারির বিপক্ষে অভিশপ্ত ম্যাচ। কোকেন টেস্ট। রিপোর্ট পজিটিভ আসা। মাদকদ্রব্য রাখার এবং বিতরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে ফিফার আদেশে ১৫ মাসের ব্যান। সবই তো সহ্য হয়ে গিয়েছিল ততদিনে।
নিষেধাজ্ঞার সময় ইন্ডোর ফুটবলে ব্যস্ত ছিলেন দিয়েগো। খবরের কাগজে কিংবা দূরদর্শনের রাত এগারোটার বুলেটিনে কখন বলবে তাঁর খবর, তা নিয়ে তখন লম্বা অপেক্ষা। এরই মাঝে খবর, বার্সেলোনা থাকার সময় মাদক সমস্যায় ভুগছিলেন মারাদোনা। সে-সময় প্রথম পরিচয় ‘ড্রাগজি’ (druggie) শব্দটার সঙ্গে। অনেকের মতে, এসব নাকি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের চক্রান্ত। কিন্তু ’৯৪ বিশ্বকাপের ওই ঘটনা অনেককে চূর্ণ করে। তছনছ করে। মারাদোনাই তো অসংখ্য অজস্র ভারতীয়কেও ‘আর্জেন্টিনীয়’ বানিয়েছেন। পাড়ায় পাড়ায় ফুটবলের কুশীলবরা নিজেকে দ্বৈতনাগরিক বলতেন তাঁরই সৌজন্যে। কিন্তু সর্বকালের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ প্লেয়ারের এমন পরিণতি আমাদের শূন্য করে, আরও শূন্য করে।
নাইজেরিয়া ম্যাচের পর যখন চাউর হয়ে গেল মারাদোনা আর মাঠে নামবেন না, বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ! অনেকের বাড়িতে এরপর যেন অঘোষিত ‘অশৌচ’ শুরু। রান্নাবাড়া নেই। কোনও রকমে আলুসেদ্ধ ভাত খেয়ে দিন কাবার অনেকের। অনেকের বাড়িতে তখন শোভা পেত মারাদোনার একটা ছবি। নামাবলি পরা বিখ্যাত সেই ছবিটা। তা কিন্তু আগের মতোই রাখা ছিল। কিন্তু তবু কেন অমন হল? অনেকে যারা প্রথমবার বিশ্বকাপ দেখা শুরু করেছে মারাদোনা-রোম্যান্টিসিজমকে কাজে লাগিয়ে, তাদের এই কঠিন বাস্তব মেনে নেওয়া কঠিন। প্রশ্ন হল, মারাদোনাকে কি ডোপকাণ্ডে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছিল? আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা। গ্রহের সবচেয়ে বড় পুঁজিবাদী দেশের বিশ্বকাপে বিদায় নিতে হয় মারাদোনাকে।
আর্জেন্টিনা তখনও ’৯৪ বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। একদিকে লা আলবিসেলেস্তেও টুর্নামেন্টের যোগ্যতা অর্জনের জন্য লড়াই করছিল। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের খাস কলকাতায় খবর পৌঁছে গিয়েছে, বোধহয় আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে খেলতে পারবে না! তার ওপর বুয়েনস আইরেসে কলম্বিয়ার কাছে ০-৫ গোলে হেরে গেল তারা। অথচ কোকো বেসিল ম্যানেজার হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছেন। আর্জেন্টিনা দারুণ দলও তৈরি করেছে। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, দিয়েগো সিমিওন এবং অভিজ্ঞ ক্লাউদিও ক্যানিজিয়া কে নেই সেই দলে! সহজেই বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করবে, এমনটা তো ধরেই নিয়েছিল সবাই। কিন্তু বাস্তবটা একটু বেশিই যেন কঠিন।
তাই অবশেষে এল সেই ডাক। দেশের প্রধান অস্ত্র মারাদোনাকে আহ্বান। একজন দেবদূতের মতো নশ্বরদের প্রার্থনার উত্তর দিয়ে মারাদোনা তাঁর দেশকে বাঁচাতে ফিরে আসেন। এমন ইতিহাস ক’জনেরই বা আছে! এসব কি কোনওদিন বুঝবেন ক্যাপিটালিস্ট দুনিয়াদারির লোকজন? মারাদোনা আসার আগে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রথম লেগের অ্যাওয়ে ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করেছিল আর্জেন্টিনা। আর জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তির পর তাঁর দেশকে বুয়েনস আইরেসে ১-০ ব্যবধানে জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই দিয়েগোই।
দূরদর্শনে প্রথম খবরটা পাওয়া গেল। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে খেলবে। কিন্তু আচমকা… ছন্দপতন! মারাদোনা ফেব্রুয়ারিতে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে নিজের নাম তুলে নিলেন। মাত্র এক লাইনেই খবর সেরে খালাস তখনকার বাংলা সংবাদমাধ্যম। দু-দিন পর কাগজে বেরল, তাঁর ওপর খুব বেশি চাপ দেওয়া হচ্ছে। আর আর্জেন্টিনার জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে মানসিকভাবে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না মারাদোনা। জানা গেল, মারাদোনার বাড়ির বাইরে হত্যে দিয়েছিল প্রেস। কিন্তু কেস ঘুরল অন্য দিকে। একটু বেশিই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করে ফেলেছিলেন। থানা-পুলিশ, আইন-আদালত কিছুই বাদ যায়নি। তবে অনেকেই আশা করেছিলেন, জুনের বিশ্বকাপের আগে সব ঠিক হয়ে যাবে। মারাদোনা খেলবেন ১৯৯৪ বিশ্বকাপে। মনেপ্রাণে এটাই চাইছিলেন সকলে। সবকিছু ঠিক হয়েওছিল। আর তারপর পুরো ছবিটাই পালটে গেল। পাড়া সেজে উঠল আর্জেন্টিনার পতাকা দিয়ে। বিক্রি হওয়া শুরু হল মারাদোনার ছবি দেওয়া জার্সি।
সত্যিকারের শিল্পী যাঁরা, তাঁরা বার্ধক্যকেও অতিক্রম করে। বিশ্বকাপে মারাদোনা হয়তো এমনই কিছু প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। সেবারের বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়েছিল গ্রিসের। ফক্সবারো স্টেডিয়ামে। প্রায় ৫৫ হাজার দর্শকের সামনে। গাঢ় ‘কালো’ জার্সি পরে খেলেছিল আর্জেন্টিনা। অনেকের বাড়িতে তখন সাদা-কালো টিভি। গাঢ় নীল জার্সিটাকে নির্ঘাত গাঢ় কালোই মনে হয়েছিল তাঁদের। ফুটবলের জাদুকরকে প্রথম লাইভ দেখার আনন্দ নিয়ে টিভির সামনে বসেছিল বহু। যে নিন্দুকেরা তাঁর বিরুদ্ধে ‘আত্মধ্বংসে’র অভিযোগ করেন, এই ম্যাচে পেনাল্টি বক্সের সামান্য বাইরে থেকে গোল করে তাঁদেরই যেন জবাব দিয়েছিলেন মারাদোনা। পরিষ্কার মনে আছে, গ্রিসের পেনাল্টি এরিয়ার বাইরে ছ’টি ওয়ান-টাচ পাসে বল এসে পড়বি তো পড় এক্কেবারে মারাদোনার বাঁ-পায়ে। সামান্য একটু টাচ দিয়েই নিজেকে অরক্ষিত করে বাঁ-পায়েই ঝটিকি শট নেন। তীরের বেগে বল চলে যায় গোলের ওপরের ঠিক বাঁ-কোণে। গ্রিসের গোলকিপার নড়তেও পারেননি। তার পরেই তাঁর সেই সেলিব্রেশন। সাইড লাইনের ক্যামেরার দিকে তাঁর ছুটে যাওয়া। মারাদোনা ছুটছেন। তাঁর পিছনে গোটা আর্জেন্টিনা দল… যাঁরা লাইভ দেখছেন, তাঁরাও যেন ছুটছেন! দলে বাতিস্তুতা, ক্যানিজিয়া-সহ একগুচ্ছ তারকা। আর্জেন্টিনা সেবারেও ফেভারিট। অথচ মাতামাতি তাঁকে ঘিরেই। এমনকী গ্রিস ম্যাচে বাতিস্তুতা হ্যাটট্রিক করলেও আলো কেড়ে নেন মারাদোনাই।
এরপর এক রবিবারের গল্প। সামনে নাইজেরিয়া। মাঝরাতে খেলা শুরু হতে উলটো পড়ল। প্রথম ১০ মিনিটের আগেই এগিয়ে গেল নাইজেরিয়া। তবে মারাদোনা যখন আছেন, একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে। এমন আশায় তখন অনেকে। এমন ভাবতে ভাবতেই ফ্রি-কিক পেল আর্জেন্টিনা। ফ্রি-কিক নিতে আগুয়ান মারাদোনা। কিন্তু একি! এ যে রাম ‘চুক্কি’! শট না মেরে অদ্ভুত একটা ফলস দিয়ে বল বাড়িয়ে দিলেন বাতিস্তুতার দিকে। মাটি-ঘেঁষা শট নিলেন। গোলকিপার ডানদিকে ঝাঁপ দিলেও গ্রিপ করতে পারলেন না। বল চলে আসে অরক্ষিত ক্যানিজিয়ার কাছে। ব্যস! স্কোর লাইন ১-১। সেই যে বেগ পেয়ে গেল আকাশি-সাদা ব্রিগেড, তা আর থামল না। ছয়-সাত মিনিটের মধ্যে আরও একটা গোল। মোটামুটি ৩০ মিনিটের মধ্যেই স্কোর লাইন বদলে হল আর্জেন্টিনার পক্ষে ২-১। খেলা শেষের বাঁশি বাজার সময়ও ওই রেজাল্টই রইল।
কিন্তু কিন্তু কিন্তু… ম্যাচের একদিন পরের সকালটা অন্যরকমই শুরু হল। জয়ের আনন্দ মাটি! কাগজে একটা স্টিল ছবি। মারাদোনাকে একজন মেডিক্যাল নার্স ড্রাগ টেস্টিং এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে বিবিসির ম্যাচ ক্লিপিংয়ে এই ঘটনা নজরবন্দি করেছেন অনেকেই। নাহ, এই দৃশ্য বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে মোটেও চেনা নয়। তবে, মারাদোনা কিন্তু যথেষ্ট হাসিখুশি ছিলেন। মাঠ ছেড়ে বেরনোর সময় দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বেশ হাসেনও। সেই মেডিক্যাল নার্স তখনও মারাদোনার বাঁ-হাতটি ধরে। দিয়েগোর ডান হাতে আকাশি রুমাল। একবারের জন্যও ড্রাগ টেস্ট-ফেস্ট নিয়ে মাথাই ঘামাননি মারাদোনা নিজেও হয়তো। আর্জেন্টিনা নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে। কে জানত, এই ঘটনার চারদিন পর এতটা খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে… ফিফা প্রেসিডেন্ট শেপ ব্লাটারের ঘোষণায় জানা গেল, মারাদোনার প্রস্রাবের নমুনা ইতিবাচক। নাইজেরিয়া ম্যাচে ডোপিং কন্ট্রোলের শর্ত লঙ্ঘন করেছেন মারাদোনা। তাই বিশ্বকাপে আর মাঠে নামতে পারবেন না তিনি।
বালক বয়সের ছেলেরা যেমন হয় আর কী! যারা সদ্য বিশ্বকাপ দেখা শুরু করেছে, তাদের রাগ-দুঃখ-আনন্দ সবটাই তখন প্রকট। যাঁর জন্য এত পাগলামো, যাঁকে কেন্দ্র করে প্রথম বিশ্বকাপ দেখতে বসা, শৈশবের সেই নায়কই কিনা… মারাদোনা যেন ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাকে হত্যা করেছেন। তিনিই দোষী, ইফিড্রিন পজিটিভ! খেলা থেকেও যে এত দুঃখ মেলে, এই ঘটনা না ঘটলে অনেকে জানতেই পারত না সেদিন। সেই দুঃখ আজও জুড়ায়নি অনেকের। সেই সব বালকের দল একদিন বড় হল। মারাদোনার জীবন সম্পর্কে গভীরে গিয়ে ক্ষমাও করে দিল তারা। কথায় আছে – তাপসের ক্রোধহীনতা, ধর্মের ছলহীনতা এবং বলবানের ক্ষমা স্বভাবের সর্বশ্রেষ্ঠ ভূষণ।
জানা যায়, ইফিড্রিন এমন একটি ওষুধ, যা হাঁপানি রোগীদের শ্বাসপ্রশ্বাস সহজ করতে ব্যবহৃত হয়। এটি শ্বাসনালি কিছুটা খুলে দেয়। পাশাপাশি, কিছু ক্ষেত্রে ওজন কমাতেও এটি সহায়ক হতে পারে। বোস্টনে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে নামার আগের দিনগুলিতে সর্দি-কাশিতে ভুগছিলেন মারাদোনা। নাক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এর থেকে রেহাই পেতে ‘দ্য প্রফেসর’-এর সাহায্য চেয়েছিলেন মারাদোনা। প্রফেসর ছিলেন ফার্নান্দো সিগনোরিনি। মারাদোনার দীর্ঘদিনের ট্রেনার। ড্যানিয়েল সেরিনির সঙ্গে তিনি ’৯৪ বিশ্বকাপের ১২ মাস আগে থেকে ব্যক্তিগতভাবে মারাদোনার ফিটনেস দেখাশোনা করছিলেন। তো তাঁরা কীভাবে এই ওষুধ মারাদোনাকে দিয়েছিলেন, তা এখনও কুয়াশায় ঢাকা। কুয়াশা কেটে গেলেই ঝকঝকে আকাশ। মারাদোনার জীবনও তেমনই। বারবার তাঁর জীবন কুয়াশায় ঢেকেছে, বারবার কুয়াশা কেটেওছে। এতে তাঁর ‘ঈশ্বরত্ব’ নষ্ট হয়নি। ঈশ্বরের গায়ে কলঙ্ক লেপা যায় না যে।
এই বিষয়ে আরও খবর
সর্বশেষ খবর
-
ছাব্বিশে ফিরল ʼ১৪-র স্মৃতি, ৭ গোল দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু জার্মানির
-
সই জাল কাণ্ডে কুণাল-অভিষেককে মুখোমুখি জেরা, বয়ানে অসংগতি সাংসদের! ফের তলবের ভাবনা সিআইডির
-
লেবানন নিয়ে ইজরায়েল-ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা, ‘আমরা শান্তির দোরগোড়ায়’, বার্তা ট্রাম্পের
-
ক্রিকেট মাঠে ফের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ ভারতের, পাকিস্তানকে উড়িয়ে বিশ্বকাপ শুরু স্মৃতি-দীপ্তিদের
-
হাতের সঙ্গে জুড়ছে মমতার তৃণমূল? জল্পনার মাঝেই ২১ জুলাই ‘শহিদ তর্পণে’ রাহুলকে আনার প্রস্তুতি প্রদেশ কংগ্রেসের




