Advertisement
Advertisement
ফুটবলের মহাযুদ্ধ
FIFA World Cup 2026

ভূ-রাজনীতির ‘ড্রিবল’ থেকে ব্যবসায়িক স্বার্থ, এবার ব্যতিক্রমী ফুটবলের মহাযুদ্ধ

প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণ এবং সর্বমোট ১০৪টি ম্যাচের এই বিশাল যজ্ঞ ফুটবলপ্রেমীদের যেমন রোমাঞ্চিত করছে, তেমনই এর নেপথ্যে থাকা ভূ-রাজনীতি বিশ্বমঞ্চে তৈরি করেছে নতুন মেরুকরণ।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুন ১৩, ২০২৬, ১৭:০২

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুন ১৩, ২০২৬, ১৭:০২

options
link
ভূ-রাজনীতির ‘ড্রিবল’ থেকে ব্যবসায়িক স্বার্থ, এবার ব্যতিক্রমী ফুটবলের মহাযুদ্ধ zoom
ছবি এআই দ্বারা নির্মিত।

শুভ্রাংশু রায়: বিশ্বকাপ ফুটবল, ২০২৬ (FIFA World Cup 2026)। ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এবং ঐতিহাসিক এই এই বিশ্বজনীন। বিশ্বজনীন আসর এবার আর কেবল আমেরিকার মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণ এবং সর্বমোট ১০৪টি ম্যাচের এই বিশাল যজ্ঞ ফুটবলপ্রেমীদের যেমন রোমাঞ্চিত করছে, তেমনই এর নেপথ্যে থাকা ভূ-রাজনীতি বিশ্বমঞ্চে তৈরি করেছে নতুন মেরুকরণ।

এবারের বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে তিন দেশ – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। তিন দেশের সময়, আবহাওয়া ও দূরত্ব একে অপরের থেকে অনেক আলাদা। তাই খেলোয়াড়দের বারবার দীর্ঘ ভ্রমণ করতে হবে এবং নানা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে এত বড় আয়োজন সামলানো আয়োজকদের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

তিন দেশের সময়, আবহাওয়া ও দূরত্ব একে অপরের থেকে অনেক আলাদা। তাই খেলোয়াড়দের বারবার দীর্ঘ ভ্রমণ করতে হবে এবং নানা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে এত বড় আয়োজন সামলানো আয়োজকদের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।

১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ আন্তর্জাতিক মহলে ‘ইউনাইটেড ২০২৬’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। বাণিজ্য (যেমন USMCA চুক্তি) এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ে এই তিনটি দেশের মধ্যে গত কয়েক বছরে কম রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেখা যায়নি। বিশেষ করে মেক্সিকো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত নীতি, বিশ্বকাপ প্রচারের জন্য দেওয়ালে ঐতিহাসিক তিমির মুর‍্যাল ঢেকে ফেলার বিতর্ক এবং দুই দেশের সম্পর্ক একাধিকবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এই পটভূমিতে, তিনটি দেশের একসঙ্গে এত বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনকে এক ধরনের ‘সফট পাওয়ার’ বা ‘ক্রীড়া কূটনীতি’ রূপে দেখা হচ্ছে। ফুটবল এখানে একটি সাধারণ সেতু। যা আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক বরফ গলাতে এবং উত্তর আমেরিকার আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে এই ‘ঐক্য’ কতখানি বাস্তব আর কতখানি প্রচারমূলক, তা নিয়ে খোদ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মনে সংশয় রয়েছে।

২) বিশ্বকাপ এমন একটি আয়োজন, যেখানে বিশ্বের নানা দেশের মানুষ একসঙ্গে ফুটবল উৎসব উপভোগ করেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ আমেরিকার কঠোর ‘ইমিগ্রেশন’ বা অভিবাসন নীতি ও জটিল ভিসা প্রক্রিয়া অনেকের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ ভিসা অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং কিছু দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে অনেক সমর্থক, সাংবাদিক ও ফুটবল কর্মকর্তার মার্কিনভূমে যাওয়া কঠিন হতে পারে। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং বিষয়টি বিশ্বকাপকে ঘিরে অন্যতম আলোচিত বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

ফিফার মূল দর্শন ‘সবার জন্য ফুটবল’ (Football for Everyone)। কিন্তু বর্তমান মার্কিন বাস্তবতায় বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে। এমন একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে গিয়ে আয়োজক দেশের এমন কট্টর জাতীয়তাবাদী নীতি ফিফার ভাবমূর্তিকে সংকটের মুখে ফেলেছে।

ফিফার মূল দর্শন ‘সবার জন্য ফুটবল’। কিন্তু বর্তমান মার্কিন বাস্তবতায় বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।

৩) মধ্যপ্রাচ্য সমীকরণ। ইরান বিতর্ক ও ভূ-রাজনৈতিক পারদচলমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এবারের বিশ্বকাপে ইরানীয় ফুটবল দলের অংশগ্রহণ এবং তাদের ম্যাচগুলি ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক উৎকণ্ঠা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের দীর্ঘ দিনের বৈরী সম্পর্কের ছায়া যে ফুটবল মাঠেও এসে পড়েছে, তা স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে প্রবাসী ইরানীয়দের সম্ভাব্য বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদের আশঙ্কায় ইরান ফুটবল ফেডারেশন তাদের ম্যাচগুলি মেক্সিকোতে স্থানান্তরের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছিল।

তবে রাজনৈতিক কারণে ভেন্যু পরিবর্তনের এই অনুরোধ ‘ফিফা’ সরাসরি নাকচ করে দেয়, কারণ তা করা হলে ফুটবলে রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়ে যেত। ফলে লস অ্যাঞ্জেলস এবং সিয়াটলের মতো মার্কিন শহরে, যেখানে বিশাল সংখ্যক প্রবাসী ইরানীয় বসবাস করে, সেখানে ইরানের ম্যাচ চলাকালীন রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা মোকাবিলা করা মার্কিন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ। ইরানের খেলোয়াড়দের শেষ মুহূর্তে আমেরিকায় প্রবেশের জন্য ভিসা দেওয়া হলেও ইরানের বক্তব্য এখনও টিমের বেশ কয়েকজন অফিসিয়ালকে প্রয়োজনীয় ভিসা দেওয়া হয়নি।

প্রসঙ্গত, কাতারে অনুষ্ঠিত আগের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল। সেই ম্যাচে ফলাফল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে, ১-০। তথাপি ম্যাচটি ঘিরে উত্তেজনার পারদ চরমে উঠেছিল, সে-কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। এবার ভিন্ন গ্রুপে থাকায় অন্তত গ্রুপ পর্যায়ে দু’টি দেশের সাক্ষাতের সম্ভাবনা না-থাকলেও ইরনীয় খেলোয়াড় ও অফিসিয়ালদের মার্কিন মুলুকে অবস্থান ঘিরে যে টানটান উত্তেজনা থাকবে, তা আগাম বলা যেতেই পারে।

ইরানের খেলোয়াড়দের শেষ মুহূর্তে আমেরিকায় প্রবেশের জন্য ভিসা দেওয়া হলেও ইরানের বক্তব্য এখনও টিমের বেশ কয়েকজন অফিসিয়ালকে প্রয়োজনীয় ভিসা দেওয়া হয়নি।

৪) মেক্সিকোর মানবাধিকার, কার্টেল হিংস্রতা, ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের লড়াই। মেক্সিকোর জন্য এই বিশ্বকাপ কেবল ফুটবলের উৎসব নয়, বরং নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের একটি মরণপণ চেষ্টা। দেশটিতে ‘ড্রাগ কার্টেল’ বা অপরাধী চক্রের হিংসা, নিখোঁজ হওয়া নাগরিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে দীর্ঘ দিন ধরেই সমালোচনা চলছে।

মেক্সিকো সরকার এই বিশ্বকাপকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সামনে নিজেদের নিরাপদ, স্থিতিশীল ও পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় দেশ হিসাবে তুলে ধরতে চায়। তবে প্রশ্ন উঠছে, স্টেডিয়ামের ভেতরের কড়া নিরাপত্তা কি দেশের বাস্তব সমস্যাগুলোকে ঢেকে রাখতে পারবে? মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই ফিফার এই ভেন্যু নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়, এটি এমন একটি মঞ্চ যেখানে খেলাধুলার পাশাপাশি রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ এবং ব্যবসায়িক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইতিহাস বলছে, শাসকরা অনেক সময়ই বিশ্বকাপকে নিজেদের ভাবমূর্তি গড়ার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে। যেমন ১৯৩৪ সালে ইটালিতে এবং ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপকে রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই কারণে অনেকের মতে, ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপও ব্যতিক্রম নয়।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে তিন আয়োজক দেশ তিনভাবে ব্যবহার করছে। আমেরিকা বিশ্বমঞ্চে নিজের শক্তি ও আধুনিকতার প্রদর্শন করছে, মেক্সিকো চেষ্টা করছে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটের আড়ালে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে, আর কানাডা নিজেকে বৈচিত্র্যের প্রতীক হিসাবে উপস্থাপন করছে। তবে মাঠে যখন ফুটবলাররা তাঁদের নৈপুণ্যে দর্শকদের মুগ্ধ করবেন, তখন ভিআইপি গ্যালারি আর কুটনৈতিক অলিন্দে চলবে অন্য এক খেলা। তবু ফুটবলপ্রেমীদের আশা, সব রাজনীতি ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শেষ পর্যন্ত জয় হবে কেবলই ফুটবলের।

(মতামত নিজস্ব) 
লেখক অধ্যাপক

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.