নাসভিলে জাপান দলের অনুশীলন শিবিরে গত সপ্তাহে উপস্থিত ছিল ১৪ বছরের রুই নিশিজাওয়া। স্কুলের আরও ১৪৫ জন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে তার আগমন জাতীয় দলের ফুটবলারদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য। হাতে লেখা একটি ছোট স্পিচ পড়ার সুযোগও পেয়ে যায় ওই কিশোর। কথাগুলি ‘জলবৎ তরলং’। কথার স্রোতে যেন নদী ভরা ঢেউ। সেখানে উপচে উঠছে অনুপ্রেরণা। যেখান থেকে শিখতে পারে ভারতও।
এই বিষয়ে আরও খবর
কী বলেছিল রুই? শুনলে যে কারওর ভালো লাগতে বাধ্য। তার মন্তব্য, “বিদেশে পড়াশোনা বা জীবনযাপনের সময় নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। তখন আমাদের ফুটবল দল শেখায়, কোনও পরিস্থিতিতেই হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না।” কিশোরের এই বক্তব্য এতটাই প্রভাব ফেলেছে, জাপানের হেডকোচ হাজিমে মোরিয়াসু বক্তৃতার একটি কপি চেয়ে নেন। তারপর দলের ডাইনিং হলে টাঙিয়েও দেন। ফুটবলারদের উদ্দেশে বলেন, “ওই ছেলেটার অনুভূতিই তোমাদের বিশ্বকাপে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাচ্চাদের মুখগুলো মনে রাখো।”

আমেরিকার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ইতিমধ্যেই আলোচনায় এসেছে রুই নিশিজাওয়ার এই বক্তব্য। অনেকের মতে, তরুণ প্রজন্মের আবেগই নতুন করে উজ্জীবিত করেছে জাপান দলকে। জাপানের এই সাফল্যের নেপথ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ১৯৯২ সালে জে লিগ চালু হওয়ার সময় দেশটির ফুটবল কর্তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন, ১০০ বছরের মধ্যে বিশ্বকাপ জিতবে জাপান। ২০০৫ সালে সেই লক্ষ্যকে নতুন রূপ দেওয়া হয়। যার নাম ‘প্রোজেক্ট ২০৫০’। অর্থাৎ, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বকাপ জেতাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
যার ফলও মিলতে শুরু করেছে হাতেনাতে। চলতি বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-২ ড্র। টিউনিশিয়াকে ৪-০ হারিয়ে প্রথম এশীয় দল হিসাবে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে চার গোল করার নজির গড়ে। ইটালির মতো ফুটবল শক্তি যেখানে বিশ্বকাপে জায়গা পেতে লড়াই করছে, সেখানে জাপান টানা আটবার বিশ্বকাপ খেলছে। ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিষয়টি অনেকটাই বেদনাদায়ক। ১৯৭০ এশিয়ান গেমসে জাপানকে হারিয়ে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিল ভারত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দুই দেশের ফুটবলের দূরত্ব অনেক বেড়েছে।
যাই হোক, নকআউট পর্বে যেতে গেলে সুইডেনের বাধা টপকাতে হবে জাপানকে। ইতিহাস অবশ্য ‘ব্লু সামুরাই’দের পক্ষে নয়। সুইডেনকে কখনও হারাতে পারেনি জাপান। তবে সাম্প্রতিক ফর্ম বিচার করলে ব্লু সামুরাইদেরই এগিয়ে রাখতেই হচ্ছে। বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের কাছে ১-৫ ব্যবধানে হেরেছে সুইডেন। এতে জাপানের আত্মবিশ্বাস হয়তো কয়েকগুণ বাড়বে। এবার তাদের প্রথম লক্ষ্য, নকআউট পর্বে পৌঁছে শেষ ষোলোর বাধা টপকানো। সেই স্বপ্নপূরণে অন্যতম ভরসা গোলরক্ষক জিওন সুজুকি। নেদারল্যান্ডস ম্যাচে একাধিক নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে তিনি এখন ‘হিরো’। আমেরিকায় জন্ম হলেও জাপানেই তাঁর বেড়ে ওঠা। ইটালির ক্লাব পারমার হয়ে খেলেন। তিনি বলছেন, “এই বিশ্বকাপ আমার কাছে স্বপ্নপূরণের অধ্যায়। আমরা নকআউটে যাবই। তারপর এক একটি ম্যাচ ধরে এগোতে চাই।” ঠিকঠাক পরিকল্পনা থাকলে স্বপ্ন ডানা মেলে উড়বেই। নচেৎ নিস্ট্যালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কেবলই পিছিয়ে পড়তে হবে। যেমনটা পিছিয়ে পড়েছে ফুটবলের ‘ঘুমন্ত দৈত্য’ ভারত। জাপানের এই উত্থান দেখে একটাই প্রশ্ন, ঘুম ভাঙবে কবে ব্লু টাইগার্সদের?

ভারতীয় ফুটবলের মানোন্নয়নের জন্য দ্রুত বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সঠিক পদ্ধতিতে মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা তৈরি করতে হবে। তৈরি করতে হবে যথাযথ ব্র্যান্ডিং। আঞ্চলিক ক্লাবগুলিকে নিয়ে আগামীর পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কিংবদন্তি ব্রাজিল ফুটবলার জিকো যখন জাপানের কোচ হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন তিনি জাতীয় দলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি ফেডারেশনকে বছরে দু’বার জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত নয় অথচ সম্ভাবনাময় ফুটবলারদের তালিকা পেশ করতেন। এর ফলে জাপানের জাতীয় দলের রিজার্ভ বেঞ্চের পুল আরও বড় হয়ে গিয়েছিল। এই মডেল অনুসরণ করে চিফ কোচের মাধ্যমে এমন সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের চিহ্নিতকরণ প্রয়োজন। যাতে প্লেয়িং ইলেভেনে একজন খেলোয়াড় হঠাৎ চোট পেলে একাধিক বিকল্প হাতে থাকে। ডেভেলপমেন্ট টিমকে যেভাবে ইন্ডিয়ান অ্যারোজ নাম নিয়ে আই লিগে খেলানো হত, সেরকমই আবারও ডেভেলপমেন্ট টিম খেলাতে হবে। কারণ অতীতে ইন্ডিয়ান অ্যারোজ থেকে অনেক খেলোয়াড়ই জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছে। তাছাড়াও যুব ও স্কুল স্তরে নিয়মিতভাবে ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজন করাও প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সুব্রত কাপের মতো আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট মডেল হতে পারে। ১৯৬০ সাল থেকে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টের নামকরণ করা হয়েছে ভারতীয় বিমান বাহিনীর এয়ার মার্শাল সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের নামে। এটি ভারতের প্রাচীনতম জাতীয় স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবলের প্রসারের উদ্দেশ্যেই প্রতিযোগিতাটি শুরু হয়েছিল।

‘মিশন ট্রিনিটি’ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০০২ সাল থেকে জাপান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তৃণমূল পর্যায় থেকে ফুটবলার তৈরি করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। যার ফলও পেয়েছে তারা। কাতার বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনের মতো দলকে পরাজিত করেছে জাপান। এই বিশ্বকাপেও তারা স্বপ্ন দেখাচ্ছে। প্রয়োজনে এই দেশেও এমন প্রকল্প চালু করতে হবে। পাশাপাশি দূরত্ব কমাতে হবে ক্লাব ও জাতীয় স্তরের মধ্যে। মাঠের মানেরও উন্নতির প্রয়োজন। কতগুলো বিদেশি খেলাব, সেটা ভাবাও সবার আগে জরুরি। প্রয়োজনে ৯ বা ১০ নম্বর জার্সিতে ভারতীয় খেলোয়াড় বাধ্যতামূলক করতে হবে। নাহলে এদেশে স্ট্রাইকার তৈরি হবে না। সঙ্গে বেশ কিছু আনুষঙ্গিক বিষয়ে আলোকপাত করতে হবে। তাহলেই বিশ্ব ফুটবলের ‘ঘুমন্ত দৈত্য’র ঘুম ভাঙবে। কিন্তু খারাপ লাগা অন্য জায়গায়। ১৯৯৪ সালে জাপান গিয়েছিলেন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। দেখেছিলেন ‘জে লিগ’। তার পর ভারতে জাতীয় ফুটবলকে সেই জে লিগের মতো করেই সাজিয়েছিলেন খুব যত্ন করে। তৃণমূল স্তর থেকেই ফুটবলার তৈরির ভাবনা ছিল। সেভাবেই এগোচ্ছিল, ভারতীয় জাতীয় লিগও রমরম করে চলছিল। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ডার্বি ছাড়াও বঙ্গের বাইরের বিভিন্ন রাজ্যে মাঠভর্তি থাকত।
এর ফলও পেয়েছিল ভারতীয় ফুটবল দল। ইতিহাসের সেরা র্যাকিং ৯৪-এ উঠে এসেছিল ভারত মাত্র দু’বছরের মধ্যেই। ১৯৯৬ সালে। তার পরের বছরে এল অর্থাৎ ১৯৯৭-এ এল আরও একটা ট্রফি। ভারত চ্যাম্পিয়ন হল সাফ গেমসে। ১৯৯৯-এ আবার সাফ গেমস চ্যাম্পিয়ন হল ভারত। ২০০২-এ বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইং রাউন্ডে ভারতের শুরুটা ছিল ঈর্ষণীয়। যতদূর মনে আছে, আরব আমিরশাহিকে ১ গোলে হারিয়ে স্বপ্নের সিঁড়ি গড়েছিল ভারত। পরের ম্যাচে ইয়েমেনের সঙ্গে ১-১ ড্র করে পরের রাউন্ডে যাওয়ার স্বপ্ন বেঁচে থাকলে শেষ ম্যাচে ব্রুনাইয়ের কাছে ০-৫ গোলে হেরে ভারতের বিশ্বকাপে যাওয়ার স্বপ্নের ব্যাঘাত ঘটেছিল। কিংবা ২০০২ সালে এলজি কাপ। চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। তখন কোচ ছিলেন স্টিফেন কনস্ট্যানটাইন। ২০০৭-এ সালে কোচ ববি হাউটনের হাত ধরে নেহরু কাপের শিরোপা জেতে ভারত। ’৭০-এ এই জাপানকে হারিয়েই এশিয়া কাপ ফুটবলে ব্রোঞ্জজয়ী ভারত ক্রমশ পিছড়েবর্গের দলে।

ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, জার্মানির হয়ে গলা ফাটিয়ে রক্ত গরম করছি আমরা। অথচ ভারতে মহিন্দ্রা ইউনাইটেড, জেসিটি, এফসি কোচিনের মতো অসংখ্য ঐতিহ্যশালী ক্লাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। টিমটিম করে চলছে ভারতীয় ফুটবল। হালফিলে আইএসএল নিয়ে ডামাডোলের কথা তো সকলের জানা। কোনওরকম ঠেকনা দিয়ে ‘নমো নমো’ করে লিগ হয়েছে। এই মরশুমে ভুলচুক শুধরে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এটুকুই সার নয়। বিশ্বকাপ খেলতে গেলে ফেডারেশনের যাপনে ৩৬৫ দিনের জন্য ঢুকিয়ে দিতে হবে ফুটবল সংস্কৃতি। জাগো দুস্তর পথের নব যাত্রী… সময় তো এটাই। জাপানের ফুটবল মন খারাপের দিস্তা নয়, বরং রোল মডেল হোক ভারতীয় ফুটবলের জন্য।
এই বিষয়ে আরও খবর
সর্বশেষ খবর
-
বাংলাদেশকে উড়িয়ে সেমির আশা জিইয়ে রাখলেন স্মৃতিরা
-
ছিল বধূ নির্যাতনের অভিযোগ, দলবিরোধী কাজ করে এবার সাসপেন্ড কংগ্রেস নেতা ভিক্টর!
-
এভাবেও ফিরে আসা যায়! হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ম্যাজিক, ১৬ বছর পর দেখা পিতা-পুত্রের
-
সাতে-পাঁচে থাকত না পাপ্পু, তারাতলায় বিপর্যয়ে রোজগেরে ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাথর পরিবার
-
ইতিহাসের একমাত্র ফাইনালহীন বিশ্বকাপ, নেপথ্য কারণে জড়িয়ে ভারতের নাম!




